গুলি চলছিল, কাবুল জ্বলছিল, মুজতবা আলী লিখলেন নগরী রক্ষায় এদের উৎসাহ নেই

447
Syed Mujtaba Ali ekolkata24

প্রসেনজিৎ চৌধুরী: আজ যেমন আফগানিস্তান অশান্ত। তখনও অশান্ত ছিল। রাস্তায় রাস্তায় গুলির লড়াই। কাবুল আজ যেমন আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের কেন্দ্র। তখনও তেমনি। কাবুলের সিংহাসন ঘিরে হইহই চলছিল। আফগান আমিরের শাসনে নেমেছিল গৃহযুদ্ধ। ভয়ঙ্কর সেই বর্ননা লিখেছে বহুদর্শী সৈয়দ মুজতবা আলী (Syed Mujtaba Ali)।

কাবুল জ্বলছিল। আফগান জনগন জীবন বাঁচাতে ছুটছিলেন। মুজতবা আলী লিখেছেন- “বেলা তখন চারটে হবে। দোস্ত মুহম্মদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে দেখি রাস্তায় তুমুল কান্ড। দোকানিরা দুদ্দাড় করে দরজা জানালা বন্ধ করছে…সব কিছু ছাপিয়ে মাঝে মধ্যে কানে আসছে বাচ্চায়ে সকাও আসছে, বাচ্চায়ে সকাও এসে পড়ল। এমন সময় গুড়ুম করে রাইফেলের শব্দ হল।… আমি কোনো গতিকে রাস্তা থেকে নেমে, নয়ানজুলি পেরিয়ে এক দোকানের বারান্দায় দাঁড়ালুম। স্থির করলুম, বিদ্রোহবিপ্লবের সময় পাগলা ঘোড়ার চাঁট খেয়ে অথবা ভিড়ের চাপে দম বন্ধ হয়ে মরব না; মরতে হয় মরব আমার হিস্যার গুলি খেয়ে।”

১৯১৯ সালে আফগানিস্তান স্বাধীনতা অর্জন করে। তৃতীয় আফগান-ব্রিটিশ যুদ্ধের পর ব্রিটিশ শাসিত ভারত ও আফগানিস্তানের মধ্যে আন্তর্জাতিক সীমান্ত রেখা তৈরি হয়। সেই বিখ্যাত ডুরান্ড রেখা পেরিয়ে একদিন কাবুল চলে গিয়েছিলেন সৈয়দ মুজতবা আলী। তাঁর আফগান প্রবাসের দিনলিপি ১৯৪৮ সালে বই আকারে বের হয়।
তবে ভারতের অনেক আগে স্বাধীন আফগানিরা তাদের স্বাধীনতার জাফরানি সুবাস নেয় দুর্গম জামরুদের কেল্লার বুরুজে বন্দুক ঘাড়ে রেখে।

Syed Mujtaba Ali ekolkata24

তেমনই স্বাধীন আফগান ভূমিতে চলে যাওয়া সৈয়দ মুজতবা আলীর চিরন্তন সাহিত্য ‘দেশে বিদেশে’ অবশ্য যখন বাংলাভাষী পাঠকরা পড়লেন । তখন ভারত স্বাধীন। তবে স্বাধীন দেশে গিয়ে পরাধীন দেশের লেখকের অভিজ্ঞতার কথা আজও চরম কৌতূহলের কেন্দ্রে।

আজ যখন আফগানিস্তান প্রবল রাজনৈতিক ঘনঘটার কেন্দ্রে, এক শতাব্দী আগেও তেমনই ছিল। আফগান আমির আমানউল্লাহ বনাম ব্রিটিশদের কূটখেলা, সেই সূত্রে একের পর এক গোষ্ঠীর জন্ম। কাবুল দখলে হামলা। ইটালিয়ান, রাশিয়ান- সোভিয়েত, ব্রিটিশ, ইরানি দূতাবাসের পারস্পরিক কূটখেলা আর সময় বুঝে পক্ষ বদল করা সবই ধরা রয়েছে মুজতবা আলীর লেখনিতে।

কাবুল দখলের জন্য গৃহযুদ্ধ চলছিল। “মুজতবা আলী লিখেছেন, আমান উল্লা বসে আছেন আর্কের ভিতর। তাঁর চেলা-চামুন্ডারা শহরের লোকেদের সাধ্য সাধনা করছে বাচ্চার (ডাকাত সর্দার) সঙ্গে লড়াই করার জন্য। …কাবুল শহর দুনিয়া থেকে সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন।”

কী অবস্থা ছিল কাবুল নগরীর? মুজতবা আলীর বর্ণনা- “শেতাঙ্গরা রাস্তায় বেরোচ্ছে না; একমাত্র রুশ পাইলটরা নির্ভয়ে শহরের মাঝখান দিয়ে ভিড় ঠেলে বিমানঘাঁটিতে যাওয়া-আসা করছে। হাতে রাইফেল পর্যন্ত নেই, কোমরে মাত্র একটি পিস্তল।”

আফগান জনগণ বন্দুক চালাতে ভালোবাসেন। তাঁদের কটাক্ষ করেই মুজতবার চরম উপলব্ধি দিয়ে শেষ করি। তিনি লিখছেন, ” কিন্তু আশ্চর্য নগরী রক্ষা করাতে এদের কোনো উৎসাহ নেই? দস্যু জয়লাভ করলে লুন্ঠিত হবার ভয় নেই, প্রিয়জনের অপমৃত্যুর আশঙ্কা সম্বন্ধে এরা সম্পূর্ণ উদাসীন, সর্বব্যাপী অনিশ্চয়তা এদের বিন্দুমাত্র বিচলিত করতে পারেনি!”

বহুদর্শী লেখকের জন্ম ১৯০৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর। অসমের করিমগঞ্জে। প্রয়াত হন ১৯৭৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায়।