একাত্তরের ভুল সংশোধনের ‘শিক্ষা’ নিক পাকিস্তান: Dawn

The Dawn

News Desk: সরকারের সমালোচনা করা এবং খোলাখুলি মত প্রকাশ করার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের জাতীয় দৈনিক সংবাদপত্র হিসেবে স্বীকৃত ‘The Dawn’; দেশ দু টুকরো হওয়ার ৫০ বছরে এসে এই সংবাদপত্র তাদের সম্পাদকীয়তে পাকিস্তান সরকারের ভুল করা থেকে শিক্ষা নিতে মতামত জানিয়েছে।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান হয়েছিল দ্বিখন্ডিত। পূর্ব পাকিস্তান মুছে গিয়ে রক্তাক্ত লড়াইয়ের পর তৈরি হয় বাংলাদেশ। নতুন দেশটি গঠনের সুবর্ণ জয়ন্তী ও দেশ দ্বিখণ্ডিত হওয়ার ৫০ বছরের দিনে ডন সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় শিরোনাম ‘East Pakistan Lessons’ (পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষা)।

Dawn সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, ১৯৭০ সালের নির্বাচনের পর সংখ্যাগরিষ্ঠদের সরকার গঠনের অধিকার না দেওয়া ছিল বড় ভুলগুলোর মধ্যে ছিল একটি। এর বদলে পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের মার্চে সামরিক অভিযান চালানো হয়। এতে সেনা বাহিনী এবং বাঙালি মিলিশিয়ারা নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করেছিল। নিহতদের মধ্যে বাংলাভাষীদের পাশাপাশি পূর্বাঞ্চলে বসবাসকারী অবাঙালিরাও ছিল। 

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গণ আন্দোলন প্রসঙ্গ টেনে Dawn সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছে, দেশের জনগণের একটি অংশ তাদের অধিকারের জন্য আন্দোলন করা মানে এই নয় যে, তারা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কাজ করছে।

সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছে,  পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ সংবিধানে উল্লিখিত মৌলিক প্রতিশ্রুতিগুলির সুরক্ষা চেযেছিলেন। তাদের বিশ্বাসঘাতক বলা যাবে না যেমনটি পূর্ব পাকিস্তানিদের বলা হতো। পাকিস্তানের স্বার্থেই বাংলাদেশের সাথে আরও ভালো সম্পর্ক গড়তে হবে।

সম্পাদকীয়তে পাকিস্তান সরকারকে উদ্দেশ্য করে লেখা হয়েছে, নাগরিক ও রাষ্ট্রের মধ্যে সামাজিক চুক্তিগুলো পূরণ করাও অবশ্যই অগ্রাধিকারের তালিকায় থাকতে হবে। 

‘নিয়াজি-র আত্মসমর্পণ’ সেই মন্দ্র কণ্ঠ ‘দিস ইজ অল ইন্ডিয়া রেডিও, নিউজ রেড বাই সুরজিৎ সেন…’

bangladesh liberation war ORS AIR Akashvani Kolkata

sourav-senসৌরভ সেন: ১৯৭১। আমার কিশোরবেলা। তখন এ-বাংলায় রাজনৈতিক কারণে হানাহানি ও অস্থিরতা আমাদের দ্রুত ‘বড়’ করে তুলছে। কাগজে রাজনৈতিক খবর পড়ায় বেশ আগ্রহ। আগের বছর, মানে ১৯৭০-এ স্কুলে হাফ-ইয়ারলি, অ্যানুয়েল কোনও পরীক্ষাই হতে পারেনি। সরাসরি পরের ক্লাসে। ‘মন্থর বিকেলে শিমুল তুলোর ওড়াউড়ি’র মতন সোডার বোতল ছোড়াছুড়িও সহজ, ছন্দোময় হয়ে উঠেছে। চোখের সামনে পেটো পড়া-ও তখন দৃষ্টি বা শ্রুতিতে গ্রাহ্য। এধার-ওধার থেকে খুনের খবর আসে। পাড়ায়-পাড়ায় সিআরপি-র রুট মার্চ কিংবা কুম্বিং অপারেশনে বাড়িতে ঢুকে মাঝরাতে পুলিশের খানাতল্লাশি তখন নগরজীবনের অঙ্গ।

এহেন সময়ে স্বাধীন বাংলা-র হিল্লোল! পাক-বাহিনীর বর্বরতার ছবি কাগজে-কাগজে, হত্যালীলার বিবরণ। গুলিতে হত্যা, বেয়োনেটে খুঁচিয়ে হত্যা— কত যে প্রকার! ইয়াহিয়া খান একটা আস্ত জল্লাদ, এমন একটা ছবি মনে আঁকা হয়ে গেছে। অনেক পরে শিল্পী কামরুল হাসান-চিত্রিত জল্লাদের (জানোয়ার) ছবিটি দেখে অবাক হই। মনে-আঁকা ছবির সঙ্গে প্রায় মিলে যাচ্ছে! লক্ষ-লক্ষ শরণার্থীর স্রোত। প্লাস্টিক ছাউনিতে, কংক্রিটের পাইপে তাদের আস্তানা। ধু-ধু সল্ট লেক তখন সবে গড়ে উঠতে শুরু করেছে। সেখানেও ৭২ ইঞ্চি পাইপের মধ্যে বসতি। ইতিমধ্যে লোকসভা ভোটে জিতে ইন্দিরা গান্ধী নিজের প্রধানমন্ত্রিত্ব আরও পোক্ত করে নিয়েছেন। দেশে-দেশে তাঁর দৌত্য, ছুটোছুটি কাগজে পড়ছি। নিক্সন, কিসিঞ্জার— এসব নাম শুনলে গা রি-রি করে। অন্য দিকে মনে পড়ছে— সেনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি সীমান্তের শরণার্থী শিবিরে ঘুরলেন। কাগজে প্রথম পাতায় বিবরণ। শরণার্থীদের ত্রাণের জন্য বিপুল খরচের বোঝা ভারত সরকারের কাঁধে। খবরের কাগজ, সিনেমার টিকিট— এসবের ওপর অতিরিক্ত মাশুল চাপল। চিঠিপত্রে ডাকমাশুল বাড়ল ৫ পয়সা। একটি অতিরিক্ত স্ট্যাম্প সাঁটতে হত। প্রথম-প্রথম ফ্যামিলি প্ল্যানিংয়ের ডাকটিকিটে ‘রিফিউজি রিলিফ’ ছাপ মারা হত, পরে নতুন টিকিট ছাপা হল।

bangladesh liberation war

মুক্তিযুদ্ধের পাশাপাশি চলেছিল আরেক যুদ্ধ, চিকিৎসাবিজ্ঞানের— যাকে অনেক পরে গোটা বিশ্ব স্বীকৃতি দিয়েছে। ‘ওআরএস’ বা ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন। তখন সীমান্ত-অঞ্চলে শরণার্থী শিবিরগুলোয় কলেরা ছড়িয়ে পড়েছিল ব্যাপক ভাবে। এপারের ডা. দিলীপ মহলানবিশ, ওপারের ডা. রফিকুল ইসলাম ওআরএস-এর সফল প্রয়োগ শুরু করলেন। এছাড়াও, নলজাতকের স্রষ্টারূপে চিরস্মরণীয় ডা. সুভাষ মুখোপাধ্যায় শরণার্থীদের অপুষ্টি-রোধে বানিয়েছেলেন ‘ফিশ প্রোটিন কনসেনট্রেট’।

মুক্তিযুদ্ধের খবর আসছে। ছবিও ছাপা হচ্ছে। ‘রাজাকার’, ‘আল বদর’ নামগুলো জানতে শুরু করেছি। এপারের অনেক সাংবাদিক ওপারে গিয়ে জীবন্ত বিবরণ আনছেন। কুষ্টিয়ার মেহেরপুরে অন্তর্বর্তী স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয়ে গেছে, মুজিবনগরে। টিভি তো তখন আসেনি। আকাশবাণী কিন্তু এক অসামান্য ভূমিকা পালন করেছিল! নিয়াজি-র আত্মসমর্পণের ছবিতে প্রথম সারিতে দিল্লির সংবাদপাঠক সুরজিৎ সেন! কানে শুনতে পাচ্ছি সেই মন্দ্র কণ্ঠ— “দিস ইজ অল ইন্ডিয়া রেডিও, নিউজ রেড বাই সুরজিৎ সেন…”। কলকাতা কেন্দ্রের প্রণবেশ সেন, উপেন তরফদার, দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা স্মরণে থেকে গেছে। ‘সংবাদ-বিচিত্রা’য় গ্রাউন্ড লেভেলের সরাসরি রিপোর্ট। রেডিও-য় শুনে-শুনে প্রায় মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল শেখ মুজিবের সেই ঐতিহাসিক বক্তৃতা— “এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম…”। এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’। কলকাতারই এক ঘাঁটি থেকে চলত সম্প্রচার। বেলা সাড়ে বারোটা নাগাদ অধিবেশন শুরু হত, যদ্দূর মনে পড়ছে। ও-বাংলার সময়ানুযায়ী বেলা একটা নিশ্চয়ই। শুরুতেই বাজানো হত গান : “জয় বাংলা, বাংলার জয়…”।

তারপর তো ডিসেম্বরের তিন তারিখে পাকিস্তানের বোমাবর্ষণ, ভারতের যুদ্ধঘোষণা। পুব ও পশ্চিম রণাঙ্গন। মার্কিন সপ্তম নৌবহর আসছে! কী হয়, কী হয়! রসিকজনের রটনা কিনা জানা নেই, তবে ছড়িয়ে গেল— আমাদের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জগজীবনবাবু নাকি অক্লেশে বলেছেন : আমাদেরও আই এনএস বিক্রান্ত্ আছে! বিক্রান্ত্ ছিল তখন ভারতের একমাত্র এয়ারক্র্যাফ্ট ক্যারিয়ার। তবে সপ্তম নৌবহরের কাছে নস্যি! যা হোক, বিক্রান্ত্ কিন্তু খুলনা থেকে চট্টগ্রাম অবধি নাগাড়ে পাহারা দিয়ে গেছে। সেই বিক্রান্ত্-কে বছর-আষ্টেক আগে লোহার দরে বেচে দেওয়া হল। দু’ ফোঁটা চোখের জল কেউ ফেলেছিল কি?

যুদ্ধ চলছে। ফেনি, আখাউড়া, ঝিনাইদহ, হিলি, বয়রা, ঝিকরগাছা ইত্যাদি নামগুলো ম্যাপের সঙ্গে মিলিয়ে দেখে নিচ্ছি। পালাতে গিয়ে পাক-সেনারা সেতু, রেলপথ, ভবন সব নষ্ট করে দিচ্ছে। পদ্মার ওপরে সুবিখ্যাত সারা (হার্ডিঞ্জ) ব্রিজের একটা গার্ডার ধ্বংস করা হল। বয়োজ্যেষ্ঠরা হায়-হায় করে উঠলেন। কলকাতায় ব্ল্যাক-আউট চলছে। সন্ধের পর বাইরে কুপকুপে অন্ধকার। ঘরের মধ্যে আলো না-ঠিকরানো বিশেষ ল্যাম্পশেড। একচিলতে আলোও বাইরে গেলে পুলিশে সতর্ক করে যায়। আকাশে প্লেনের আওয়াজে হামলার আশঙ্কা। টালা ট্যাঙ্ক, হাওড়া ও বালী ব্রিজ নাকি ‘দুশমনে’র পয়লা নিশানা!

অবশেষে ১৬ ডিসেম্বর। বিজয়। যুদ্ধ শেষ। জন্ম নিল স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ। সারা দেশে উচ্ছ্বাস। এ-বাংলায় অন্য এক উন্মাদনা। দেয়ালে-দেয়ালে লিখন। দু’ দেশের জাতীয় পতাকার ছবি। তবে তখন কিন্তু বাংলাদেশের পতাকা আঁকা ছিল বেশ ঝঞ্ঝাটের! কারণ মধ্যিখানে ছিল সে-দেশের মানচিত্র। সেটি নিখুঁত আঁকা বেশ কষ্টসাধ্য। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নামের আগে জুড়ে গেল বিশেষণ ‘এশিয়ার মুক্তিসূর্য’, যা এ-বাংলার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পরবর্তী কয়েক বছর ব্যবহৃত হয়েছে।

’৪৭-এ ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ভাষার জোর এতটাই যে ধর্মকে পরাভূত করে সেই রাষ্ট্রের জঠর থেকে নতুন এক রাষ্ট্র জন্ম নিল দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। পৃথিবীর ইতিহাসে এ এক অনন্য নজির।

মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের অভ্যুদয় এ-বাংলার শিল্পসাহিত্যেও দাগ রেখে গেছে। গান, কবিতা ও অন্যান্য সৃষ্টিতে মাতোয়ারা হয়েছিল মানুষ। আজ ইচ্ছে করলে সেসবের আস্বাদ নেওয়া যায়। বৈদ্যুতিন তথ্যভাণ্ডার এখন অতি সমৃদ্ধ। শুধু একটি গানের হদিশ পেতে ব্যর্থ হয়েছি। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা ‘পারাপার’ :
আমরা যেন বাংলা দেশের/ চোখের দুটি তারা।/ মাঝখানে নাক উঁচিয়ে আছে—/ থাকুক গে পাহারা।/ দুয়োরে খিল/ টান দিয়ে তাই/ খুলে দিলাম জানলা।/ ওপারে যে বাংলাদেশ/ এপারেও সেই বাংলা।।

<

p style=”text-align: justify;”>পঞ্চাশ বছর আগে এটি গান হিসেবে গাওয়া হত। সুরারোপ কার জানা নেই। আমি নিজে অনুপ ঘোষাল-কে অনুষ্ঠানে গাইতে শুনেছিলাম। ছোট্ট গান, জমজমাট সুর, এখনও দিব্যি মনে আছে। তবে কোনও মাধ্যমেই আর শুনি না, খোঁজ পাই না। পুনরুদ্ধার করা যায় কি?

Bangladesh50: পাকিস্তান ‘দ্বিখণ্ডিত’, পাঁচ দশক পর কালচক্র ফেরাল ঐতিহাসিক বৃহস্পতিবার

Bangladesh

প্রসেনজিৎ চৌধুরী: তারিখ-বার আবর্তিত হয় দিনপঞ্জির নিয়ম মেনে। সেই কালচক্র পঞ্চাশ বছর পর ফিরিয়ে দিল ঐতিহাসিক ‘বৃহস্পতিবার’। পাকিস্তান দ্বিখণ্ডিত হওয়ারও ৫০ বছর আজ অর্থাৎ ১৬ ডিসেম্বর, ২০২১ সাল।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দিনও বৃহস্পতিবার! সেই দিন অখণ্ডতা খুইয়ে দ্বিখণ্ডিত পাকিস্তানের মানচিত্র তৈরি হয়েছিল। রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের পর বিশ্ব থেকে সরকারিভাবে মুছে গেছিল পূর্ব পাকিস্তান নাম। নতুন ভূখন্ড বাংলাদেশ (Bangladesh)।

১৯৪৭ সালে ভারত হয় দ্বিখণ্ডিত। তৈরি হয় পাকিস্তান। নবগঠিত পাকিস্তানের দুই অংশ। একদিকে পশ্চিম পাকিস্তান অন্যদিকে পূর্ব পাকিস্তান। মাঝে বিশাল ভারত। একদিকে পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকা অন্যদিকে দেশটির রাজধানী করাচি (পরে ইসলামাবাদ)।

দেশভাগের যে যন্ত্রণা নিয়ে অখণ্ড ভারতবাসী ভয়াবহ পরিস্থিতির মাঝে নিজ নিজ ভূখণ্ড ভারত ও পাকিস্তান বেছে নিয়েছিলেন, তাঁদের সামনে আরও একটি ভাঙন অপেক্ষা করেছিল। পাকিস্তান জন্ম নেওয়ার ২৪ বছরের মধ্যে দু টুকরো হয়ে যাওয়া আন্তর্জাতিক ইতিহাসের এক অতি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

বহু দেশ দ্বিখণ্ডিত হয়েছে। আবার সংযুক্ত হয়েছে। এই ভাঙা-গড়ার খেলায় পাকিস্তানের দু টুকরো হয়ে যাওয়ায় সর্বাধিক প্রভাব পড়ে ভারতে। যে দেশ ১৯৪৭ সালে রক্তাক্ত পরিস্থিতির মাঝে টুকরো হয়েছে আগেই।

পাকিস্তান জন্ম নেওয়ার পর থেকে দেশটির পূর্বাংশ বা পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের নিজ ভাষা বাংলার উপর খবরদারি করার কাজটি করতে গিয়ে বিপদ ডেকে এসেছিলেন স্বয়ং পাক জনক মহম্মদ আলি জিন্না। বাংলাভাষী অধ্যুষিত পূর্ব পাকিস্তানে এসে তাঁর ঐতিহাসিক উক্তি বাংলা নয় উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র জাতীয় ভাষা এই মন্তব্যই দেশটি টুকরো হবার প্রথম শুরুয়াত।

তারপর কবি জীবনানন্দের রূপসী বাংলায় ‘রক্তনদী কল্লোল্লিত’ হয়েছে বহুবার।মেঘনা, পদ্মা, ধানসিড়ি, কপোতাক্ষের স্রোত বেয়ে কালচক্রের টানে হাজির ১৯৫২, ঐতিহাসিক ভাষা অধিকার রক্ষার বিজয় বছর। রক্তাক্ত আন্দোলনে বাংলাকে সরকারি ভাষার স্বীকৃতি পাক সরকারের। পরবর্তী সময়ে পাক সামরিক আইনের দমননীতির প্রতিবাদে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের রক্তাক্ত সময় পেরিয়ে হাজির ১৯৭১ সাল।

বজ্রকণ্ঠে হুঙ্কার এলো পূর্ব পাকিস্তানের মাটি থেকে এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। মুজিব ভাষণের উন্মাদনায় ভেঙে পড়েছিল পাক শাসনের সামরিক দম্ভ দেয়াল। জলে-জমিতে লাউমাচা ধানক্ষেতের আড়ালে সেই মুক্তির সংগ্রামের নয় মাসের পর্ব পরিয়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান দ্বিখণ্ডিক হয়ে গেল।

এই ইতিহাসের সমান অংশীদার ভারত। বাংলা ভাষার দেশের জন্ম ইতিহাসের প্রতিটি পাতায় লেখা আছে ভারতের নাম।

Bangladesh 50: বায়ুসেনার বোমা বৃষ্টিতে পাক গভর্নর কাঁপছিলেন, যেমন ছিল ঐতিহাসিক পদত্যাগ মুহূর্ত

Indian airforce raid

প্রসেনজিৎ চৌধুরী: “That was the end of the last government of East Pakistan.” (পূর্ব পাকিস্তান সরকার শেষ হয়ে গেল)। ভারতীয় বিমান হামলা ও প্রবল বোমা হামলার মাঝে কোনওরকমে নিজেকে বাঁচিয়ে ব্রিটিশ সাংবাদিক গাভিন ডেভিড ইয়ংয়ের পাঠানো সংবাদটির বিখ্যাত সেই বাক্যটি দিয়ে ৫০  (Bangladesh 50) বছর আগের ঐতিহাসিক এক মুহূর্তের কথা শুরু করলাম।

আক্ষরিক অর্থেই ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর শেষ হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানের মাটিতে পাকিস্তানি শাসন। ঢাকার গভর্নর জেনারেল ড. আবদুল মোতালেব মালিক (ড. মালিক) কাঁপা কাঁপা হাতে পদত্যাগ পত্রে দস্তখত করেছিলেন। পূর্ব পাকিস্তান সরকার পতনের ঐতিহাসিক মুহূর্তটির সাক্ষী লন্ডনের ‘The Daily Observer’ সংবাদপত্রের ঢাকা প্রতিনিধি ডেভিড ইয়ং (Gavin David Young)।

East Pakistan
বোমা হামলায় গভর্নর হাউসের ছাদ ভাঙার পর

মুক্তিযুদ্ধ পরিস্থিতির সংবাদ সংগ্রহ করতে ১৪ ডিসেম্বর পাক সেনা পরিবেষ্টিত গভর্নর হাউসে (এখনকার বঙ্গভবন) ঢুকেছিলেন ডেভিড ইয়ং। ভিতরে চলছিল পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ড. মালিকের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক। পদত্যাগ নাকি যুদ্ধ চলবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে গভর্নর দ্বিধান্তিত ছিলেন। সেই বৈঠক চলার মাঝেই ঢাকার আকাশ জুড়ে ভারতীয় যুদ্ধ বিমানের চক্কর কাটা শুরু হয়। অলি গলি, বিভিন্ন বাড়ির ছাদে জীবন হাতে রেখে উঠে এসে ঢাকাবাসী চিৎকার শুরু করলেন জয় বাংলা আ আ আ…।

Indian airforce
ঢাকার আকাশে ভারতীয় বিমান বাহিনীর প্যারাট্রুপার অপারেশন শুরু

গভর্নর হাউসে রাষ্ট্রসংঘ প্রতিনিধি ও রয়টার্স সংবাদ সংস্থার সঙ্গে হাজির ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড ইয়ং সংবাদে লিখেছেন, বৈঠকের মাঝে শুরু হয়ে গেল ভারতীয় বিমান বাহিনীর বোমা বর্ষণ। বৃষ্টির মতো বোমা পড়তে শুরু করেছে। পরপর বোমা হামলায় গভর্নর হাউসের বিখ্যাত দরবার হলের ছাদ হড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ল।

জীবন বাঁচাতে পাক গভর্নর ড মালিক দৌড়ে বাগানে ট্রেঞ্ঝের ভিতর ঝাঁপ দিলেন। এমনই সংবাদ ছিল রয়টার্সের।
ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড ইয়ং লিখেছেন, পূর্ব পাকিস্তানের সরকার থাকবে না পদত্যাগ করবে এই সমস্যার সমাধান করে দিয়েছিল ভারতীয় বিমান হামলা। সেই ভয়াবহ পরিস্থিতির মাঝে অফিসের একটা বাতিল সাদা কাগজে বল পয়েন্ট পেন দিয়ে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের কাছে পদত্যাগ পত্র লিখলেন গভর্নর ড. মালিক।
পদত্যাগ পত্র লেখার আগে গভর্নর ড.মালিক ধর্মীয় কিছু নিয়ম পালন করেন। বোমা হামলার মাঝেই তিনি এসব করেছিলেন। সংবাদে এমনই লিখেছেন ব্রিটিশ সাংবাদিক ইয়ং।

Bangabhaban
বর্তমান বঙ্গভবন

পঞ্চাশ বছর আগের ১৪ ডিসেম্বর পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক সরকারের পতন হয়ে গেছিল। গভর্নর পদ থেকে পদত্যাগ করেই ড. আবদুল মোতালেব মালিক রাষ্ট্রসংঘ প্রতিনিধির সাহায্যে আশ্রয় নিলেন আন্তর্জাতিক রেডক্রস অধীনস্ত যুদ্ধনিরপেক্ষ স্থান ঢাকার বিখ্যাত হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে। শেষ হয়ে গেল পূর্ব পাকিস্তানের শাসন।

ঢাকার সেই গভর্নর হাউস বর্তমান বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রপতি বাসভবন। বঙ্গভবন হিসেবে সুপরিচিত। এই ঐতিহাসিক ভবন ঘিরে বারবার সেনা বাহিনীর বন্দুক বিতর্কিত মুহূর্ত তৈরি করেছে। বিশেষত ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে খুনের পর বঙ্গভবন ঘিরে সেনাবাহিনীর দু পক্ষের মুখোমুখি অবস্থান-ক্ষমতা দখলের রোমহর্ষক মুহূর্ত।

Bangladesh 50: একা ইন্দিরার ‘সেই থমথমে রাঙা মুখখানি আজও চোখে ভাসছে’

indira gandhi

সৌরভ সেন: ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধের ৫০ বছর। আবার বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধেরও পাঁচ দশক (Bangladesh 50)। সেইসব দিনরাত্রি এখনও যেন মনে হয় এই তো গতকাল ঘটে গেল!sourav-sen
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ চলছিল। কলকাতা তখন পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা শরণার্থীদের ভিড়ে ছয়লাপ। রাজনৈতিক ঘনঘটা প্রবল। পূর্ব পাকিস্তান রক্তাক্ত। আর পশ্চিমবঙ্গে চলছিল তীব্র রাজনৈতিক ঘাত প্রতিঘাত। কংগ্রেস ও বামপন্থীদের রাজনৈতিক লড়াই।অতিবামপন্থীদের সশস্ত্র রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড।

আসি ৩ ডিসেম্বরের কথায়। পাকিস্তান বিমান বাহিনী হামলা শুরু করেছিল পাঞ্জাব, রাজস্থান ও উত্তরপ্রদেশে। পরপর বোমা ফেলল আগ্রা, আম্বালা, যোধপুরে। আর পূর্বদিকে আগরতলায় বোমা পড়ল।

ইন্দিরা গান্ধী তখন কলকাতায়। খবর পেয়েই দ্রুত ফিরলেন রাজধানী। তখন ই এম বাইপাস চিন্তার বাইরে। ভিআইপি-দের যাতায়াতের রুট বলতে ভিআইপি রোড- কাঁকুড়গাছি – মানিকতলা – বিবেকানন্দ রোড- গিরিশ পার্ক -সেন্ট্রাল (চিত্তরঞ্জন) অ্যাভিনিউ- এসপ্ল্যানেড-রাজভবন।

সন্ধের দিকে আচমকা রটে গেল—কর্মসূচি বাতিল করে ইন্দিরা ফিরে যাচ্ছেন। গলির মোড়ে- বিবেকানন্দ রোডে আমি, দিদি, পাড়ার বন্ধুবান্ধব, সঙ্গে বড়রাও দাঁড়িয়ে গেলাম। একটি বড় জিপ, পিছনটা খোলা, সেখানে চেয়ারে বসে থমথমে মুখে একটা কাগজ পড়ছেন তিনি। মুখে আপতিত আলো। যাত্রা-অভিমুখের উল্টো দিক করে বসে। একদম একা। গভীর অভিনিবেশে কাগজ পড়তে-পড়তে চলে গেলেন। অভ্যাসমতো কোনও হাত নাড়া ইত্যাদি নয়। তাঁর সেই থমথমে রাঙা মুখখানি আজও চোখে ভাসছে।

তখন ওই কম বয়সে বুঝিনি, পরে সম্যক বুঝেছি যে ওই মুখ ছিল নিজের চিন্তা, নিজের বোধ-কে মথিত করে এক কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার মুখ, ওই মুখে ছিল বিশ্ব-রাজনীতিতে এক চিরস্মরণীয় পদক্ষেপের প্রস্তুতি।

পঞ্চাশটা বছর পেরিয়ে এলাম!

(১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর পাকিস্তান হামলার পরে ভারত শুরু করেছিল প্রত্যাঘাত। কলকাতা থেকে দিল্লি ফিরে যুদ্ধ ঘোষণা করেন ইন্দিরা গান্ধী। সে এক ঐতিহাসিক মহূর্ত। )

Bangladesh: পাকিস্তান কেটে বাংলাদেশ জন্মের সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠান শুরু ১৬ ডিসেম্বর

bangladesh

News desk: রক্তাক্ত নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধ শেষ করে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ আত্মপ্রকাশ করে। জন্ম নেওয়ার পর ৫০ বছর পার হতে চলেছে। সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠান পালিত হবে এই দিনেই। জানিয়েছেন বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।

তিনি বলেন, আগামী ১৬ ডিসেম্বর থেকে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর অনুষ্ঠান শুরু হচ্ছে। ১৬ ডিসেম্বরের আগেই মুজিব শতবর্ষ অনুষ্ঠান সরকার শেষ করতে চায় বলেও জানান বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

আরও পড়ুন: Kolkata: বঙ্গবন্ধুকে উৎসর্গ করেই কলকাতা বইমেলা

Bangladesh 16 december

অনুষ্ঠানে বিদেশি অনেক অতিথি আসার কথা। দু’জন রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান আসতে পারেন। দুই দিনব্যাপী (১৬-১৭ ডিসেম্বর) অনুষ্ঠান হবে সংসদের দক্ষিণ প্লাজায়। এমনই জানিয়েছেন তিনি।

বাংলাদেশ সরকার স্পষ্ট না করলেও মনে করা হচ্ছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ড. লোটে শেরিং ঢাকায় আসতে পারেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশকে সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিয়েছিল ভুটান। তার পরেই ভারত স্বীকৃতি দেয়।

বাংলাদেশের সুবর্ণ জয়ন্তী অনুষ্ঠান ঘিরে চলছে ব্যপাক প্রস্তুতি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জানান, জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে ১৬ তারিখে অনুষ্ঠান হবে। কড়া নিরপত্তা থাকবে। অনুষ্ঠান ও উৎসবস্থলের এক কিলোমিটারের মধ্যে গ্যাস সিলিন্ডারের গাড়ি ঢুকতে করতে পারবে না। এই সময় ভ্রাম্যমাণ দোকান থাকবেন না এবং নির্মাণকাজ বন্ধ থাকবে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিস্থল ও সারাদেশে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।

<

p style=”text-align: justify;”>১৯৭১ সালে পাকিস্তান দ্বিখণ্ডিত হয়। রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধ শেষে ডিসেম্বরের ১৬ তারিখ পাকিস্তান আত্মসমর্পণ করেছিল ভারতীয় ও মুক্তিবাহিনীর যৌথ কমান্ডের কাছে।

Exclusive: কলকাতার ঐতিহাসিক মুক্তিযুদ্ধ সদর কার্যালয় ভারতের কাছে চাইল বাংলাদেশ

Historic 8 Theatre Road house

#Bangladesh 1971 war
প্রসেনজিৎ চৌধুরী: তখন মাঠ ঘাট কচুরিপানা ধানক্ষেতের আড়ালে পাকিস্তানের সেনার বিরুদ্ধে তীব্র লড়াই করছিলেন বাংলাদেশি গেরিলারা। এই ‘মুক্তিযোদ্ধা’দের সদর কার্যালয় ছিল কলকাতায়। ঐতিহাসিক সেই ৮ নম্বর থিয়েটার রোডের বাড়ি (বর্তমান সেক্সপিয়ার সরণী) থেকে ‘মুজিবনগর সরকার’ (প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার) পরিচালিত হতো। বাড়িটিতে সংগ্রহশালা বানাতে অধিগ্রহণ করতে চায় বাংলাদেশ সরকার। এই বিষয়ে ভারতের কাছে অনুরোধ করা হয়েছে ঢাকার তরফে।

এই বাড়িতেই ছড়িয়ে আছে ১৯৭১ সালের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার পরিচালনার ইতিহাস। বাড়িটি আরও একটি কারণে বিখ্যাত। বাড়িটি ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামী অরবিন্দ ঘোষের(ঋষি অরবিন্দ) মামার বাড়ি। এই বাড়িতেই তাঁর জন্ম হয়। এই বাড়ির নাম অরবিন্দ ভবন।

Historic 8 Theatre Road house

রবিবার ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার বিক্রম দেরাইস্বামী বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের বৈঠক হয়। এই বৈঠকেই উঠেছে কলকাতার ঐতিহাসিক ৮ নম্বর থিয়েটার রোডের বাড়ির প্রসঙ্গ। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী অনুরোধ করেন, দ্রুত বাড়িটি যেন হস্তান্তর করা হয়।

কলকাতার এই বাড়ি থেকেই ১৯৭১ সালের টানা নয় মাসের বেশি সময় ধরে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলা মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছিল। অস্থায়ী সরকারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ, সেনাপ্রধান কর্নেলসন এমজিএ ওসমানি, অর্থমন্ত্রী মনসুর আলি সহ মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডাররা বৈঠক করতেন।

india Bangladesh minister meeting

পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যা শুরু হয়েছিল। সীমান্ত পেরিয়ে চলে আসা বহু বুদ্ধিজীবী, লেখক শিল্পীরা কলকাতাতেই আশ্রয় নিয়েছিলেন। বিবিসি জানাচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ভারত সরকার ও প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ কেন্দ্র হিসেবে ছিল এই বাড়ি। প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারকে এই ভবন দিয়েছিল ভারত সরকার।

বিবিসি জানাচ্ছে কলকাতার ৮ নম্বর থিয়েটার রোডে (বর্তমান শেক্সপিয়ার সরণী) অরবিন্দ ভবন নামের বাড়িটিতে নেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কোনও স্মৃতিফলক। তবে অরবিন্দ ভবনের সঙ্গে বাংলাদেশের ইতিহাস জড়িত। ফলে বাংলাদেশ সরকার বাড়িটি অধিগ্রহণ করতে আগ্রহী।

ভারতীয় হাইকমিশনারকে দেওয়া বার্তায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী যুদ্ধের সময় ভারত সরকারের সহায়তার কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন। ভারতের হাইকমিশনার বিক্রম দ্বেরাইস্বামী বলেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক পরীক্ষিত। দুই দেশের বন্ধুত্ব আরও সুদৃঢ় হবে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে উন্নয়নের ভূয়সী প্রশংসা করেন দ্বেরাইস্বামী।

টিক্কা খানের সেনাকে টেক্কা দেওয়া গণহত্যার রিপোর্টার সাইমন ড্রিং প্রয়াত

British journalist saimon dring dies at 76

নিউজ ডেস্ক:  যেখানেই মুক্তি সংগ্রাম সেখানেই হাজির লন্ডন টেলিগ্রাফের সংবাদদাতা সাইমন ড্রিং। ষাট-সত্তর দশকে কখনো ভিয়েতনাম তো কখনও ঢাকা, পরে হাইতির গণসংগ্রামের রিপোর্টার প্রয়াত হলেন। কিংবদন্তি সাংবাদিকের বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর। তাঁর পাঠানো বিশ্ববিখ্যাত সংবাদগুলির অন্যতম “ট্যাংকস ক্র্যাশ রিভোল্ট ইন পাকিস্তান “। এই শিরোনামে লন্ডন টেলিগ্রাফ খবর প্রকাশ করতে বিশ্ব কেঁপে গিয়েছিল। স্পষ্ট হয়েছিল ততকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ঠিক কী ঘটাচ্ছে পাকিস্তানের সেনা। জেনারেল টিক্কা খানের নির্দেশে শুরু হয়েছিল গণহত্যা ও শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা নেমেছিলেন মুক্তিযুদ্ধে।

লন্ডনের ডেইলি টেলিগ্রাফ সংবাদপত্রের হয়ে ভিয়েতনামে আমেরিকান সেনার বর্বরতা লিখে বিশ্ব কাঁপাচ্ছিলেন সাইমন ড্রিং। সেখান থেকে তাঁকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকার রাজনৈতিক পরিস্থিতির খবর সংগ্রহ করতে পাঠান লন্ডন টেলিগ্রাফ কর্তৃপক্ষ। ১৯৭১ সালের ঢাকা তখন পাকিস্তানি সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে তীব্র গণ আন্দোলনের কেন্দ্র।

সাইমন ড্রিং ভিয়েতনাম থেকে ঢাকা আসার পর পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিঘোরালো হয়। ২৫ মার্চ পাকিস্তান সরকার ঢাকায় গণহত্যা “অপারেশন সার্চলাইট” শুরু করে। বিদেশি সাংবাদিকদের ঢাকা থেকে জোর করে করাচি নিয়ে যায় পাক সেনা। কিন্তু টিক্কা খানের সেনাবাহিনি কে টেক্কা দিলেন ব্রিটিশ সাংবাদিক সাইমন ড্রিং। তিনি আত্মগোপন করেন ঢাকার বিখ্যাত হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের ভিতর। ২৫ মার্চের ভয়াবহ ট্যাংক অভিযান ও গণহত্যার বিবরণ তিনিই হোটেল থেকে দেখে সাংকেতিক আকারে লিখে রাখেন। তাঁর খোঁজে হোটেলে পাক সেনার তল্লাশি চলছিল। সাইমন ড্রিং গুটিকয়েক হোটেল কর্মীর সাহায্যে কখনো জলের ট্যাংকের ভিতরে, চেয়ার টেবিলের আড়ালে, রান্নাঘরে লুকিয়ে ছিলেন।

২৫ মার্চ ঢাকায় গণহত্যা শুরুর পর ২৭ মার্চ সকালে কারফিউ তুলে নেয় পাক সরকার। মৃতদেহে ঢেকে থাকা ঢাকার রাজপথে প্রবল ঝুঁকি নিয়ে ছবি ও বিবরণ সংগ্রহ করেন সাইমন ড্রিং। তারপর লেখেন ‘ট্যাংকস ক্র্যাশ রিভোল্ট ইন পাকিস্তান’ শিরোনামের এক প্রতিবেদন। সেই প্রতিবেদন ৩০ মার্চ প্রকাশ করে লন্ডন টেলিগ্রাফ। আন্তর্জাতিক এক্সক্লুসিভ এই বিবরণ পাকিস্তানের মুখোশ খুলে দেয়। সংবাদ প্রকাশের পরেই আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র শেরগোল পড়ে যায়।

আর লুকিয়ে থাকা সম্ভব হয়নি। সাইমন ড্রিংকে বন্দি করে পাক সরকার। প্রবল অত্যাচার করে তাঁকে ঢাকা থেকে করাচি নিয়ে যাওয়া হয়। ব্রিটিশ নাগরিক হওয়ায় তাকে অবশ্য ছাড়তে বাধ্য হয় পাকিস্তান। লন্ডন ফিরে সাইমন ড্রিং ঢাকার বিবরণ পরপর প্রকাশ করতে থাকেন। গণহত্যার সেই বিবরণগুলি বিশ্বজুড়ে আলোড়ন ফেলে দেয়।

মুক্তিযুদ্ধের সংবাদ সংগ্রহের জন্য সাইমন ড্রিং লন্ডন থেকে কলকাতা আসেন। কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত এলাকা থেকে ঘুরে এসে প্রতিবেদন লিখতেন। টানা ৯ মাস মুক্তিযুদ্ধের পর পাকিস্তানের থেকে ছিন্ন হয়ে তৈরি হয় বাংলাদেশ। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর সাইমন ড্রিং নতুন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় আসেন ভারতীয় সেনার সঙ্গে। পরবর্তীতে দীর্ঘ সময় বাংলাদেশের সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন সাইমন ড্রিং।

শুধু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নয়, হাইতি দ্বীপের গণসংগ্রামে আমেরিকান সেনার হামলার খবর ঘটনাস্থল থেকে লিখেছেন তিনি। প্রবল বিভিন্ন পড়েছিল ওয়াশিংটন। আর ভিয়েতনামের মুক্তিসংগ্রামের রিপোর্ট লিখে সাইমন ড্রিং তো মার্কিন সরকারের চক্ষুশূল হয়েইছিলেন। অকুতোভয় সাংবাদিক পরে দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ কথক সাইমন ড্রিংয়ের প্রয়াণ সংবাদে বাংলাদেশ, হাইতি, ভিয়েতনাম শোকস্তব্ধ।