লক্ষ্মী সেহগাল: স্বাধীনতার ইতিহাসে রামায়ণের উর্মিলা

Lakshmi Sehgal

অনুভব খাসনবীশ, কলকাতা: নেতাজী সুভাষ বসুর ডাকে লক্ষ্মী সেহগাল আজাদ হিন্দ ফৌজের নারী ব্রিগেড “ঝাঁসীর রানী”র দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে দেশ থেকে বিতাড়িত মানুষের পাশে দাঁড়াতে অসামান্য ভূমিকা পালন করেছেন। উদ্বাস্তু শিবির পরিচালনাসহ কলকাতায় বাংলাদেশী শরণার্থীদের চিকিৎসা, সবেতেই সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। যদিও তাঁকে স্বচ্ছন্দে তুলনা করা যায় রামায়ণের উর্মিলার সঙ্গে।

উর্মিলা! রামের অনুজ লক্ষ্মণের স্ত্রী। রাম-সীতা-লক্ষ্মণের বনবাসকালে অযোধ্যায় একাকী কাটিয়েছেন৷ অপেক্ষা করেছেন তাদের জন্য। সরাসরি যুদ্ধে অংশ না-নিলেও মহাকাব্যে তাঁর ভূমিকাও অপরিসীম। অথচ সীতাকে নিয়ে রামায়ণে যে বন্দনা, তার সিকিভাগও জোটেনি তাঁর কপালে। গোটা রামায়ণেই তিনি উপেক্ষিতা। ভারতের স্বাধীনতা ইতিহাসে এই মহীয়সী নারীও অনেকটা সেরকম। যদিও উর্মিলার মত তিনি নতুন ভোরের অপেক্ষাই শুধু করেননি, নেতৃত্ব দিয়েছেন রাতের যুদ্ধেও।

লক্ষ্মী সেহগালের জন্ম ২৪ অক্টোবর, ১৯১৪ সালে মাদ্রাজে (বর্তমান চেন্নাই)। ১৯৩৮ সালে মাদ্রাজ মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি লাভ করেন। এক বছর পর গাইনোকোলজি এবং অবস্টেট্রিক্স বিষয়ে ডিপ্লোমাধারী হন। চেন্নাইয়ের ত্রিপলিক্যান এলাকার সরকারি কস্তুর্বা গান্ধী হাসপাতালে ডাক্তার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। সাবালিকা অবস্থা থেকেই সামনে থেকে দেখেছেন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন। বিশেষত প্রাক-স্বাধীনতা আন্দোলন সেই সময় সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছে গিয়েছে। ক্রমশ বাড়ছে ইংরেজদের অত্যাচার! পাল্লা দিয়ে শহিদ হচ্ছেন দেশের একের পর এক সন্তান। ফলে, দেশসেবার বীজ তাঁর মনে বপণ হয়েছিল প্রায় শিশুকালেই। যদিও তা বৃক্ষের আকার নিল ভারতবর্ষের মাটিতে নয়, সিঙ্গাপুরে।

Lakshmi Sehgal

১৯৪০ সালে সিঙ্গাপুরে পাড়ি দেন লক্ষ্মী সেহগাল। সেখানেই সাক্ষাৎ হয় নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু’র ভারতীয় জাতীয় সেনাবাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে। সেখানে ভারতবর্ষ থেকে আসা শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবার লক্ষ্যে একটি ক্লিনিক স্থাপন করেন। শুরু হয় ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ। এর তিনবছর পর ১৯৪৩ সালে সিঙ্গাপুর যান স্বয়ং নেতাজি। প্রস্তুতি শুরু করেন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম অভ্যুত্থানের। শুধু পুরুষরা নন, যাতে অংশ নিয়েছিল বহু মহিলারাও।

এই প্রস্তুতিকালে নারী রেজিমেন্ট গঠনের কথা বলেন সুভাষচন্দ্র বসু। লক্ষ্মী সেহগাল বিষয়টি শোনেন৷ রেজিমেন্টের দায়িত্ব নিতে এগিয়ে আসেন৷ পরিচিত হন ‘ক্যাপ্টেন’ লক্ষ্মী সেহগাল পরিচয়ে। পরে তাঁর এবং নেতাজির এই নারী বাহিনীই পরিচিতি পায় বিখ্যাত ঝাঁসির রাণী বাহিনী নামে। আজাদ হিন্দ ফৌজ জাপান সাম্রাজ্যের সেনাবাহিনীর সঙ্গে বার্মা অভিমুখে ডিসেম্বর, ১৯৪৪ সালে রওনা দেয়। কিন্তু মার্চ, ১৯৪৫ সালে প্রবল যুদ্ধে পিছু হটতে বাধ্য হয়। এর ফলে আইএনএ নেতৃবৃন্দ সিদ্ধান্ত নেয় যে, তাদের বাহিনী ইম্ফলে প্রবেশ করবে। ক্যাপ্টেন লক্ষ্মী সেহগাল, ১৯৪৫ সালে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর হাতে গ্রেফতার হন এবং পরবর্তী একবছর বার্মায় কারাগারে আটক ছিলেন। দিল্লিতে আইএনএ সদস্যদের বিচারপ্রক্রিয়া চলাকালীন তিনি অবিভক্ত ভারতে ফিরে আসেন।

১৯৪৭ সালে তাঁর স্বপ্ন সফল হয়৷ স্বাধীন হয় ভারতবর্ষ। সেই বছরেই লাহোরে কর্ণেল প্রেম সেহগালের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। সেহগাল দম্পতির দু’টি কন্যা সন্তান – সুভাষিণী আলী এবং অনিশা পুরী। বিয়ের পরেই সেবার কাজ থামাননি তিনি৷ কানপুরে গড়ে তোলেন দাতব্য চিকিৎসালয়।

১৯৭১ সালে যোগ সিপিআই (এম)-এ, রাজ্যসভায় দলের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেন। তার দশবছর পর সিপিআই (এম)-এর অখিল ভারতীয় জনবাদী মহিলা সমিতির নারী শাখার প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য হন। ১৯৮৪ সালের ডিসেম্বরে ভূপালের গ্যাস দূর্ঘটনায় চিকিৎসক দলের নেতৃত্ব দেন। সেই বছরেই শিখবিরোধী দাঙ্গার প্রেক্ষাপটে শান্তি বজায় রাখার স্বার্থে জনসংযোগ করেন।

২০০২ সালে চারটি বামপন্থী দল – বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক দল এবং অল ইন্ডিয়া ফরোয়ার্ড ব্লক, সিপিআই, সিপিআই (এম.এল) লক্ষ্মী সেহগালকে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিসেবে মনোনিত করেন৷ যদিও তিনি এপিজে আব্দুল কালামের কাছে পরাজিত হন। ২০১২ সালের ১৯ জুলাই ক্যাপ্টেন লক্ষ্মী সেহগাল হৃদযন্ত্রজনিত রোগে আক্রান্ত হন। চারদিন হাসপাতালে কাটানোর পর প্রয়াণ ঘটে এই মহীয়সী নারীর।

স্বাধীনতার আন্দোলনে শহিদ হওয়া বিভিন্ন বিপ্লবীর কথা আমরা ইতিহাসে পড়ি৷ তাদের বীরগাঁথা স্মরণও করি বিশেষ বিশেষ দিনে। কিন্তু, এক বীরাঙ্গনাকে সামনে পেয়েও সম্মান জানাতে ব্যর্থ দেশ। অনেকের মতে প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে অংশ নিয়েই রাজনৈতিক বিভিন্ন নেতার বিরাগভাজন হয়েছেন তিনি। ফলে সীতা নন, স্বাধীনতার ইতিহাসে উর্মিলা হয়েই রয়ে গিয়েছেন তিনি।

পুরাণ কথা: জগন্নাথ ও রথযাত্রার ইতিহাস-দ্বিতীয় পর্ব

সোমবার, ২৭ আষাঢ় অর্থাৎ ইংরাজির ১২ জুলাই শুভ রথযাত্রা৷ প্রথম পর্বে জগন্নাথ মূর্তি ও মন্দিরের প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে আমরা জেনেছি৷ দ্বিতীয় পর্বে আমরা জানবো রথযাত্রা কী এবং কেন হয়? যা নিয়ে লিখলেন টিঙ্কু মণ্ডল

রথযাত্রা হল হিন্দু ধর্মের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব এবং বাঙালির সংস্কৃতি ও সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ৷ এই উৎসবটি কাঠের তৈরি রথে করে কাঠের তৈরি বিগ্রহকে পরিভ্রমণ করানো হয়৷ কথিত আছে, দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ দাদা বলরাম এবং বোন সুভদ্রাকে নিয়ে রথে করেই বৃন্দাবনে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন৷ সেই স্মৃতি মাথায় রেখেই আজও এই উৎসব পালিত হয়৷ প্রকৃত অর্থে রথ উৎসব শুরু হয় জগন্নাথ দেবের স্নানযাত্রা দিয়ে৷ এখন জেনে নেওয়া যাক, কী এই স্নানযাত্রা?

প্রতি বছর জৈষ্ঠ্য মাসের পূর্ণিমা তিথিতে পুরীতে জগন্নাথ দেবের স্নানযাত্রা আয়োজিত হয়৷ এদিন মন্দিরের গর্ভগৃহ থেকে মূর্তি তুলে এনে স্নান মন্ডপে তা স্থাপন করা হয়৷ তারপর সুগন্ধি জল দিয়ে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রাকে স্নান করানো হয়৷ স্নানের পর শুরু হয় মূর্তির সাজসজ্জা৷ কথিত আছে, ১০৮ ঘড়া জলে স্নানের পর জ্বরে কাবু হয়ে পড়েন জগন্নাথ দেব৷ তাই এই সময় তাঁকে গৃহবন্দি অবস্থায় কাটাতে হয়৷ রথ পর্যন্ত বিশ্রাম নেন তিনি৷ ফলে সেই সময় ভক্তদের দর্শন দেন না জগন্নাথ দেব৷ এমনকী এই ক’দিন জগন্নাথের পুজোও বন্ধ থাকে৷ তারপর জ্বর থেকে উঠে রথে চেপে মাসির বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেন জগন্নাথ দেব৷ জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা রথ চড়ে ‘গুন্ডিচার’ বাড়ি যান৷ যা জগন্নাথ দেবের ‘মাসির বাড়ি’ নামে পরিচিত৷ জগন্নাথ দেবের ‘মাসির বাড়ি’ পর্যন্ত রথ চড়ে যাওয়াকে বলে ‘সোজা রথ’৷ এরপর সাতদিন মাসির বাড়িতে থাকার পর সেই রথে চড়েই পুনরায় নিজের মন্দিরে ফেরেন জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা৷ তাঁর মাসির বাড়ি থেকে মন্দিরে ফিরে আসার এই যাত্রা ‘উল্টো রথ’ নামে প্রসিদ্ধ৷

রথযাত্রায় তিনটি বিগ্রহ তিনটি আলদা আলাদা রথে থাকে৷ এই রথ গুলির বিশিষ্ট্যও আলাদা৷ সবার প্রথমে থাকে বড় ভাই বলরামের রথ৷ এই রথের নাম তালধ্বজ৷ ১৪টি চাকা বিশিষ্ট এই রথটির উচ্চতা ৪৪ ফুট৷ আর রথের আবরণ নীল রঙের হয়৷ তারপর থাকে সুভদ্রার রথ৷ যার নাম দর্পদলন৷ এই রথটি ১২টি চাকা-সহ ৪৩ ফুট উচ্চতার অধিকারী৷ এই রথের মাথায় একটি পতাকা থাকে৷ যার মধ্যে একটি পদ্মচিহ্ন আঁকা আছে৷ তাই এই রথটিকে পদ্মধ্বজও বলা হয়৷ এই রথটি আবরণ লাল রঙের হয়৷

সর্বশেষে থাকে জগন্নাথ দেবের রথ৷ এই রথটির উচ্চতা ৪৫ ফুট৷ আর এই রথে থাকে ১৮টি চাকা৷ এই রথটির নাম নন্দীঘোষ৷ এই রথের মাথায় যে পতাকা থাকে, তাতে কপিরাজ হনুমানের মূর্তি আঁকা থাকে৷ তাই এই রথের আর এক নাম কপিধ্বজ৷ জগন্নাথ দেবের রথটি সম্পূর্ণ লাল ও হলুদ কাপড় দিয়ে মোড়া থাকে৷ রথের দিন প্রতিটি রথকে ৫০ গজ দঁড়িতে বেঁধে আলাদা আলাদা করে টেনে নিয়ে যাওয়া হয় মাসির বাড়ির দিকে৷ এই রথকে আমাদের দেহ এবং বিগ্রহগুলিকে আমাদের আত্মার সঙ্গে তুলনা করা হয়ে থাকে৷

প্রতি বছর পুরীর রথযাত্রার উদ্বোধন করেন এখানকার রাজা৷ রাজত্ব না-থাকলেও বংশপরম্পরায় পুরীর রাজপরিবার আজও আছে এবং সেই নিয়মানুসারে যিনি রাজা উপাধি পান তিনি পরপর তিনটি রথের সামনের অংশ সোনার ঝাড়ু এবং সুগন্ধি জল দিয়ে ঝাঁট দেন৷ তারপর পুষ্পাঞ্জলি প্রদান করেন এবং রথের দঁড়িতে টান পড়ে৷

কথিত আছে, যে ব্যক্তি রথে চড়ে জগন্নাথ দেবকে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড দর্শন করাবেন ভগবান তাঁদের প্রতি অশেষ কৃপা বর্ষণ করবেন৷ ‘বৃহন্নারদীয়’ পুরাণে ভগবান নারায়ণ স্বয়ং লক্ষ্মী দেবীকে বলেছেন, ‘‘পুরুষোত্তম ক্ষেত্র নামক ধামে আমার কেশব মূর্তি বিরাজওমান৷ মানুষ যদি কেবল সেই শ্রী বিগ্রহ দর্শন করেন, তবে খুব সহজেই আমার ধামে আমার কাছে ফিরে আসতে পারবে৷’’

আজ আমরা জানলাম, ভারতের সব থেকে প্রসিদ্ধ তীর্থস্থান গুলোর মধ্যে ওডিশার পুরী অন্যতম বিশেষ তীর্থস্থান রূপে প্রতিষ্ঠিত৷ পুরীর রথযাত্রার মাহাত্ম্যও প্রচুর৷ তবে কালক্রমে শুধু পুরীতেই নয়, এই উৎসবের প্রচলন ঘটেছে পশ্চিমবঙ্গের বিভ্ন্ন অঞ্চলে৷ এর মধ্যে হুগলির শ্রীরামপুরে মাহেশের রথযাত্রা, পুর্বমেদিনীপুরের মহিষাদলের রথযাত্রা, মায়াপুরের ইস্কন মন্দিরের রথযাত্রা খুবই প্রসিদ্ধ৷ এমনকী বাংলাদেশের ধামরাই জগন্নাথের রথ বিশেষ প্রসিদ্ধ৷ তৃতীয় অর্থাৎ শেষ পর্বে আমরা এই অঞ্চলের রথ উৎসব সম্পর্কে জানবো৷
‘জয় জগন্নাথ’