বড়পর্দায় আসছে রুপোর মেয়ে চানুর বায়োপিক

Olympic silver medallist Mirabai Chanu

নিউজ ডেস্ক: মীরাবাঈ সাইখোম চানুর হাত ধরেই চলতি টোকিও অলিম্পিক্সের মঞ্চ থেকে এসেছে প্রথম পদক। ২১ বছরের খরা কাটিয়ে ভারোত্তোলনে দেশকে অলিম্পিক্স পদক এনে দিয়েছেন তিনি। ৪৯ কেজি বিভাগে রূপো জয় করেছেন চানু। পাঁচ বছর আগে রিও অলিম্পিক থেকে খালি হাতে ফিরতে হলেও টোকিওতে ভারতকে প্রথম পদক দিয়েছেন তিনি।

এবার সেই মীরাবাঈ সাইখোম চানুর আত্মজীবনী ফুটে উঠবে বড় পর্দায়। মেরি কম, সাইনা নেহওয়ালদের পর এবার বায়োপিকের তালিকায় জুড়ে গেল মীরাবাঈয়ের নামও। মণিপুরের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে এসে কীভাবে বিশ্বমঞ্চে দেশের প্রতিনিধিত্ব করলেন, কীভাবে দারিদ্রকে হারিয়ে লক্ষ্যে অবিচল থাকলেন, কীভাবে কঠোর পরিশ্রমের পর রুপো এনে দিলেন দেশকে, চানুর জীবনের এসব কাহিনিই এবার ভেসে উঠবে রুপোলি পর্দায়।

সদ্য রূপোর পদক নিয়ে বাড়িতে ফিরেছেন চানু। ২ বছর পর বাড়ির খাবার খেয়েছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে বাড়ি ফিরে মাটিতে বসে তার সেই খাওয়ার ছবি। যা দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছেন অভিনেতা আর.মাধবণ। চানুর জন্য পুরস্কার ঘোষণা করেছে ভারত সরকার। তার সঙ্গে দেখা করেছেন ক্রীড়ামন্ত্রী কিরণ রিজিজু। মণিপুরের সরকার তাঁর জন্য এক কোটি টাকা পুরস্কার অর্থ ঘোষণা করেছে। চানুকে সম্মান জানিয়ে পুলিশের এএসপি পদে নিযুক্ত করা হয়েছে। চানুর অতি সাধারণ জীবন যাপন,পরিশ্রম ও সংগ্রাম নিয়ে এখনও নেটিজেনরা সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচনা করেন। এবার মণিপুরী ছবিতে অলিম্পিক্স পদকজয়ীর এই সাধারণ জীবনযাপনই ফুটে উঠবে।

ইতিমধ্যেই এ নিয়ে ইম্ফলের সেউতি ফিল্মস প্রযোজনা সংস্থার সঙ্গে কথাবার্তাও নাকি হয়ে গিয়েছে চানুর। শুধু মণিপুরী ভাষাই নয়, পাশাপাশি ইংরাজি ও অন্যান্য কিছু ভাষাতেও মুক্তি পাবে। প্রাথমিক চুক্তিপত্রে সইও সেরে ফেলেছেন চানু। এবার প্রশ্ন হল, চানুর চরিত্রে কাকে দেখা যাবে? এর আগে মেরি কমের চরিত্রে দুর্দান্ত অভিনয় করেছিলেন প্রিয়ঙ্কা চোপড়া, সাইনা এখনও মুক্তি না পেলেও শুটিঙয়ে নিজেকে নিংড়ে দিচ্ছেন প্রিয়ঙ্কার বোন পরিণীতিও। সেরকমই চানুর চরিত্রের জন্যও প্রয়োজন একজন বলিষ্ঠ অভিনেত্রীর।

প্রযোজনা সংস্থার তরফে জানানো হয়েছে, ‘‌মীরাবাঈ চানু হিসেবে মানাবে, এমন একজনকে আমরা খুঁজছি। বয়স, উচ্চতা, শরীরের গঠন- সবদিক থেকেই চানুর সঙ্গে মানানসই হওয়া প্রয়োজন। তারপর তাঁকে চানুর মতো করে ট্রেনিং দেওয়া হবে। চানুর মতোই কঠিন ট্রেনিং করতে হবে অভিনেত্রীকে। সব মিলিয়ে শুটিং শুরু হতে এখনও মাস ছয়েক দেরি।’‌ যদিও, বলিউডে চানুর বায়োপিক নিয়ে ভাবনাচিন্তা শুরু হয়েছে কিনা তা জানতেই এখন উৎসুক প্রত্যেকে।

মৈতৈ উপজাতির মীরাবাঈ কৃষ্ণপ্রেমিক, দুরন্ত ঘোড়সওয়ার সেনার উত্তরসূরী

Origin of Olympic silver medalist meitei community mrmber mirabai chanu

বিশেষ প্রতিবেদন: যুদ্ধ ও প্রেমে মিথ্যে বলা যায়। মিথ্যে নয়, বরং রোমাঞ্চকর সত্যি কথা এটি। টোকিও অলিম্পিকে ভারোত্তোলন প্রতিযোগিতায় রূপো জয়ী সোইখম মীরাবাঈ চানুর রক্তে প্রেম ও যুদ্ধের ঘনঘটা মিশে রয়েছে। এতে জড়িয়ে আছে মৈতৈ জাতির ইতিহাস, সংঘর্ষ, প্রেম ও কূটচাল।

লিখিত ইতিহাস কম করেও দু’হাজার বছরের। তার থেকেও প্রাচীন বহুশ্রুত কথা। এই বর্নিল অধ্যায়ে জড়িয়ে আছে মৈতৈ উপজাতিদের জীবন। এদের ব্যাপ্তি মায়ানমার থেকে পুরো উত্তর পূর্ব ভারত জুড়ে, কিছুটা বাংলাদেশের পাহাড়ি জনজীবনে।

মীরাবাঈ। তিনি রাজস্থানের রাজপুতানি ঐতিহাসিক চরিত্র। তাঁর কৃষ্ণ অনুরাগে রাধা পর্যন্ত বেসামাল হন। যুগ যুগ ধরে মীরা নামটি শ্রীকৃষ্ণ অনুরক্তদের মধ্যে ছড়িয়ে। উত্তর পূর্বাঞ্চলের মনিপুর নরম কৃষ্ণপ্রেমে মগ্ন। তবে ভয়ঙ্কর হতেও দেরি করেনা। বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যাগুরু জনসংখ্যার মনিপুরিদের সবথেকে বড় অংশ মৈতৈ জাতি। প্রাচীন ব্রহ্মদেশ বর্তমান মায়ানমার থেকে সমগ্র উত্তর পূর্বাঞ্চল দুনিয়ায় মৈতৈ জাতির প্রভাব কম নয়।

Mirabai Chanu-Manipur

একাধারে কৃষ্ণপ্রেমে কাতর মৈতৈরা। রসকলি আর পান টুসটুসে মুখ, কীর্তন-খোলের ঝংকার তাদের মন শান্ত করে। সময় বুঝে তলোয়ার ঝলসে ওঠে হাতে। ছোটে ঘোড়া বাহিনি। শত্রুর মাথা কেটে নিতে হাত কাঁপেনা এতটুকু। পৌরাণিক আখ্যানে শ্রীকৃষ্ণের কূটনৈতিক ছলাকলার যে বিস্তর উদাহরণ রয়েছে তাতেও পটু মৈতৈ বা সংখ্যাগুরু মনিপুরি।

মৈতৈ সংস্কৃতি, ভাষা, সামাজিক কাঠামো মনিপুরি জাতির মূল আধার মেনে নিয়েছেন গবেষকরা। যুদ্ধের ঝনঝনানি মনিপুর কম দেখেনি। যুদ্ধ কম করেনি। মহাভারতের বর্ণনায় অর্জুনকে পরাজিত হতে হয়েছিল এই মনিপুরেই। জয়ী হন রাজকুমারী কৃষ্ণপ্রেমিক চিত্রাঙ্গদা। তিনিও অর্জুনের স্ত্রী।

পুরাণ যদি বিশ্বাস না হয়, তাহলে অন্তত দু হাজার বছর আগের ইতিহাস ঘেঁটে গবেষকদের বের করা তথ্যগুলো চরম বিশ্বাসযোগ্য। তারা বলছেন, রাজার হয়ে যুদ্ধ, রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে লডাই, ষড়যন্ত্র সবেতেই সমান ভূমিকা নিয়েছে মৈতৈরা। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এই ভূমিকা ধরে রেখেছে মৈতৈ জাতি। তলোয়ার, তীর বারবার শত্রুর রক্তে সুখানুভূতি লাভ করেছে।

একেবারে বিংশ শতাব্দী থেকে হাল আমলের ইতিহাসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ হোক বা ১৯৭১ সালের ভারত পাকিস্তানের মধ্যে সংঘর্ষ, বাংলাদেশের স্বাধীনতার লড়াই, বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র পথ নেওয়া তলোয়ার ছেড়ে রাইফেল, এ কে ৪৭ নিতেও খামতি নেই মৈতৈদের। উত্তরপূর্ব ভারতে যতগুলি ভয়াবহ নাশকতা ঘটনো হয়েছে তার মধ্যে মনিপুরের মাটিতে সেনা কনভয়ে হামলায় দেশ নড়ে গিয়েছে বারবার।

রক্তের নেশা ও কৃষ্ণপ্রেম মৈতৈ জাতির সঙ্গে জড়িয়ে। কখনও তলোয়ার তো কখনও আগ্নেয়াস্ত্র এই জাতির দুরন্ত ভয়াল মাপকাঠি। বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসে বারবার রক্তাক্ত মনিপুরি তথা মৈতৈ জাতির মীরাবাঈ চানু জন্মের পর থেকেই সেনা ও বিচ্ছিন্নতাবাদী সংঘর্ষের সাক্ষী। তেমনই সাক্ষী বিতর্কিত আফস্পা আইনেরও।