Suniti kumar Chatterjee: ভাষা নিয়ে খেলতেন রবীন্দ্রনাথ, বিশ্বকবির ভাষাচার্য ছিলেন এই বাঙালি

Suniti kumar Chatterjee

বিশেষ প্রতিবেদন: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে ভাষাচার্য উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। কবিকে যেমন শুধু তার জীবন-চরিতে পাওয়া যায় না, তেমনই বিশ্ববিশ্রুত ‘ওরিজিন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অব বেঙ্গলি ল্যাংগোয়েজ’ বা ওডিবিএল-এর সীমার মধ্যে আটকা পড়ে থাকার লোক সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় (Suniti kumar Chatterjee) নন। আসলে তাঁর প্রধান আগ্রহের বিষয় ছিল মানবসভ্যতার আবহমান বৈচিত্র। হিউম্যানিটিজ-এর সামগ্রিক চর্চাতেই তিনি পেয়েছিলেন বেঁচে থাকার জ্বালানি।

তাঁর অভিযানের রাজপথ ছিল, ভাষা। মতি শীলের অবৈতনিক ইস্কুল থেকে ভারতের জাতীয় অধ্যাপক— এই আশ্চর্য উড়ান কিন্তু কোনও দিনই ‘বিদ্যা দদাতি বিনয়ং’ প্রবাদকে চ্যালেঞ্জ জানায়নি। তাঁর প্রতিভার প্রশংসা করলে তিনি অবলীলায় বলতেন, ইউরোপের যে কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোর ঝাঁট দিলে নাকি দশ-বিশটা সুনীতি চাটুজ্যে পাওয়া যাবে। আবার ব্যক্তিগত লাইব্রেরির বই কাউকে দেখাতে হলে তাঁকে উৎসর্গ করা বইগুলো লুকিয়ে রাখতেন, পাছে সেটা আত্মপ্রচার হয়ে দাঁড়ায়। কোনও মানুষের, এমনকী ছাত্রছাত্রীদেরও প্রণাম নিতেন না, উলটে তাদের ‘আপনি’ সম্বোধন করতেন।

ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে কোনও অজানা বিষয় জানলে অন্য অধ্যাপকদের সামনেই সেই স্বীকৃতি দিতেন। ছাত্রী হিসেবে সুকুমারী ভট্টাচার্য তো এর জন্য লজ্জিত বোধ করার কথাই স্বীকার করেছেন। জ্ঞানচর্চার চূড়ায় পৌঁছে যাওয়ার পরেও কোনও ভাল বক্তৃতা শুনলে বলতেন, ‘এ সব শুনলে বুঝি কত সামান্য জানি, কত জানবার ছিল।’ বার বার বলতেন রবীন্দ্রনাথের কথা। রবীন্দ্রনাথ তাঁর কাছে শুধু প্রিয় কবি নন, ছিলেন আদর্শ মানুষ। রবীন্দ্রনাথের নায়ক অমিত সুনীতিবাবুর বই নিয়ে শিলং-এ গিয়েছিল। সুনীতিবাবুর মনে হত রবীন্দ্রনাথ যেন এ ভাবেই তাঁকে অমরত্ব দিয়ে গেলেন।

মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান সুনীতিকুমার হাওড়া জেলার শিবপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা হরিদাস চট্টোপাধ্যায় ছিলেন ইংরেজদের সদাগরি অফিসের কেরানি। তিনি মতিলাল শীল ফ্রি স্কুল থেকে ১৯০৭ সালে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় ৬ষ্ঠ স্থান অধিকার করে কুড়ি টাকা বৃত্তি লাভ করেন। স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে ১৯০৯ সালে ৩য় স্থান অধিকার করে এফ.এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি। অতঃপর প্রেসিডেন্সী কলেজ থেকে ১৯১১ সালে ইংরেজিতে সম্মানসহ বি.এ শ্রেণীতে ১ম স্থান অধিকার করেন। ১৯১৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে এম.এ শ্রেণীতে ১ম স্থান অর্জন করেন। ১৯১৮ সালে সংস্কৃতের শেষ পরীক্ষায় পাস করেন এবং প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ বৃত্তি এবং জুবিলি গবেষণা পুরস্কার অর্জন করেন।

কৃতিত্বের সাথে এম.এ ডিগ্রী অর্জনের পর তিনি কলকাতা বিদ্যাসাগর কলেজে ইংরেজির অধ্যাপক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। এরপর ১৯১৪ – ১৯১৯ সাল পর্যন্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে একই বিষয়ের অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯১৯ সালে তিনি ভারত সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় লন্ডনে যান এবং লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ধ্বনিবিজ্ঞানে ডিপ্লোমা লাভ করেন। ১৯২১ সালে ঐ একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি.লিট ডিগ্রী লাভ করেন। তাঁর অভিসন্দর্ভের বিষয়বস্তু ছিল ‘ইন্দো-আরিয়ান ফিললিজ’।

লন্ডনে থাকাকালীন সময়ে তিনি ধ্বনিতত্ত্ব ও ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাতত্ত্ব ছাড়াও প্রাকৃত ভাষা, ফার্সি ভাষা, প্রাচীন আইরিশ ভাষা, পুরনো ইংরেজি ও গোথিক ভাষায় ব্যুৎপত্তি লাভ করেন। অতঃপর লন্ডন থেকে তিনি প্যারিসে গমন করেন। সেখানে তিনি প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ে স্লাভ ও ইন্দো-ইউরোপিয়ান ভাষাতত্ত্ব, প্রাচীন সগডিয়ান ও প্রাচীন খোতানী ভাষা, গ্রীক ও লাতিন ভাষার ইতিহাস এবং অস্ট্রো কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এশিয়াটিক ভাষাতত্ত্ব বিষয়ে অধ্যয়ন করেন। ১৯২২ সালে দেশে ফিরে আসার পর স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় কর্তৃক ভারতীয় ভাষাতত্ত্বের ‘খয়রা’ অধ্যাপক হিসেবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পুণরায় কর্মজীবন শুরু করেন। এখানে দীর্ঘ ৩০ বছর কাজ করার পর ১৯৫২ সালে এমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে পুণঃনিযুক্ত হন।

অধ্যাপক তারাপুরওয়ালা’র কাছে আবেস্তা অধ্যয়ন করেন। বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ সম্পর্কে ৩ খণ্ডের দি অরিজিন এন্ড ডেভেলপম্যান্ট অব দ্য বেঙ্গলী ল্যাঙ্গুয়েজ গ্রন্থখানি রচনা করে অসাধারণ বিদ্যাবত্তার পরিচয় প্রদান করেন। অন্যান্য রচনাবলী হল – বেঙ্গলী ফোনেটিক রিডার, কিরাত জনকৃতি, ভারত-সংস্কৃতি, বাঙ্গালা ভাষাতত্ত্বের ভূমিকা, পশ্চিমের যাত্রী, ইউরোপ ভ্রমণ, জাতি সংস্কৃতি সাহিত্য, ভারতের ভাষা ও ভাষা সমস্যা, সংস্কৃতি কী, দ্বীপময় ভারত, রবীন্দ্র সঙ্গমে, শ্যামদেশ ইত্যাদি।

১৯২৭ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চারজন ভ্রমণসঙ্গীর একজন হয়ে সুনীতিকুমার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া সফরে যান। এই সময় তিনি ভ্রমণ করেন বালি, জাভা, কুয়ালালামপুর, মালাক্কা, পেনাং, সিয়াম ও সিঙ্গাপুর। “যাত্রী” গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ এই ভ্রমণের বিবরণ লিপিবদ্ধ করেন। এসব দেশে তিনি রবীন্দ্রনাথের আদর্শ এবং ভারতীয় সংস্কৃতি ও শিল্প সম্বন্ধে বক্তৃতা প্রদান করেন।

Courtney Walsh: ভারতীয় উপমহাদেশের অ্যাওয়ে সিরিজে রুপকথার নায়ক

Courtney Walsh

Sports desk: ইতিহাসে কোনো ফাস্ট বোলার কোটনি ওয়ালশের (Courtney Walsh) মতো অ্যাওয়ে সিরিজে উইকেট পাননি। ২৭৪ উইকেট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন গ্লেন ম্যাকগ্রা। জেমস অ্যান্ডারসন ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে সফল দ্রুত বোলার-এই তালিকায় ষষ্ঠ স্থানে রয়েছেন, তার মাত্র 36% ডিসমিসাল হোম থেকে এসেছে।

200 টিরও বেশি উইকেট নেওয়া দশজন দ্রুতগতির বোলারদের মধ্যে ওয়ালশের গড় 25.03 এবং স্ট্রাইক রেট 57 মার্শাল, অ্যামব্রোস, হ্যাডলি এবং ম্যাকগ্রার চেয়ে খারাপ, তবে ওয়ালশ ওয়াসিম আক্রম এবং ওয়াকার ইউনিসের সাথে আছেন এবং সাম্প্রতিক সময়ে থেকে এগিয়ে অ্যান্ডারসন এবং জাহির খান থেকে।

এশিয়ায় মহাদেশ ঐতিহ্যগতভাবে দ্রুতগতির বোলারদের জন্য সবচেয়ে কঠিন ছিল – ওয়ালশ সমস্ত তর্ককে ব্যাকফ্রুটে ঠেলে দিয়ে সেরা সফরকারী ফাস্ট বোলার ছিলেন; তার 20.53 গড় (76 উইকেট) এবং 45 এর স্ট্রাইক রেট ওয়েস হলের সংখ্যার চেয়ে (সামান্য) খারাপ, মহাদেশের পিচে 54 উইকেট নিয়েছিলেন,এমন সময়ে যখন অনাবৃত পিচ ঢেকে রাখা হতো না কভার দিয়ে।

মার্শাল এবং ডেল স্টেইন – যাঁরা উভয়েই এশিয়াতে আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন, এবং যাদের রেকর্ডে তাদের মুকুটে রত্ন রয়েছে – ওয়ালশের তুলনায় এশিয়ার গড় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি, যদিও স্টেইনের স্ট্রাইক রেট ভাল।
কোটনি ওয়ালশকে বিশেষ করে ভারত ও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দুর্ধর্ষ ফর্মে দেখা গিয়ছিলো। তার কেরিয়ারের বেশিরভাগ সময় এশিয়ার সেরা দুই দলের বিরুদ্ধে (ভারত -পাকিস্তান) দেশে ২৯টি ইনিংসে চার বা তার বেশি উইকেট নিয়েছিলেন।

কোটনি ওয়ালশ ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটের সোনালি সময়ের প্যাকের মাঝখানে অনেকটা জায়গা জুড়ে, সমসাময়িক অন্যান্য দ্রুতগতির বোলারদের

স্পষ্ট পারফরম্যান্সের পার্থক্যের দিক দিয়ে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ওয়ালশের বাইশ গজের সার্ভিস কেরিয়ারে এশিয়াতে জিতেছে এমন চারটে টেস্ট ম্যাচ ( সাতটি হেরেছে এবং ছয়টি ড্র করেছে), এই সময়ে ওয়ালশ 16.04 গড়ে 21 উইকেট শুধুমাত্র এশিয়া মহাদেশের পিচে।

ক্যারিবিয়ানদের জয়ের ক্ষেত্রে তার সেরা পারফরম্যান্স ১৯৮৬ লাহোর টেস্ট ম্যাচ, যখন ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে 7 উইকেট ওই সময়ে এককথায় দুরন্ত পাকিস্তান দলকে উড়িয়ে দিয়েছিল এবং 1987 সালে দিল্লি টেস্ট, যেখানে ওয়ালশ দ্বিতীয় ইনিংসে 5 উইকেট নিয়ে একটি সিরিজ নির্ধারণ জয়ের অসামান্য নজির স্থাপন করেছিলেন।

1994 সালে মোহালিতে তার 5 উইকেট শিকার এবং প্রথম ইনিংসে ভারতের হয়ে শতরান করা মনোজ প্রভাকরের নাক ভাঙতে ওয়ালশের দুর্ধর্ষ লিফটার ক্রিকেটের ইতিহাসে ভয়ঙ্কর সত্য সঙ্গে পড়তে পড়তে উত্তেজনার মোড়কে নির্মম বাস্তব।

এছাড়াও 1980 সময়ে ফিরে যাওয়া ওয়েস্ট ইন্ডিজের দীর্ঘ অপরাজিত সিরিজের ধারাটি ভাঙতে বাধা দেয় কোটনি ওয়ালশ। পরের বছর অস্ট্রেলিয়া অবশেষে ওয়েস্ট ইন্ডিজের অপরাজিত থাকার বাধা টপকে ক্যারিবিয়ানদের ক্রিকেটের বাইশ গজে দাপুটে রাজত্বর সমাপ্তি ঘটায়।

এমন এক যুগ সন্ধিক্ষণে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটের দাপুটে পতনের মাঝের সময়েও কোটনি ওয়ালশ শুধুমাত্র নিজের খেলাকে তুলে ধরেন এমন এক আঙ্গিকে, যেখানে ক্যারিবিয়ান ক্রিকেট সাম্রাজ্যের চরম পতন বাইশ গজে একপ্রকার সময়ের অপেক্ষা ছাড়া আর কিছুই ছিল না।

এ সপ্তাহের গল্প: অভিমান

যুগল পণ্ডিত

হাবুল মরে গিয়েছে গত শীতে। বীরেনও কিছুদিন আগেই এই শীতে।
মুখটা ফ্যাকাশে ছিল বীরেনের। ঘন কুয়াশায় দেখা ভাঙাচোরা বাড়ির মতো।

দাঁড়িয়ে থাকলে কুয়াশা ভেদ করে দেখা যায় না কিছু। এগিয়ে যেতে যেতেই পরিষ্কার হয়।

পেছনেও ছুটে আসে কুয়াশা।
ইউক্যালিপ্টাস গাছ, কলেজ, সরকারি ভবন–
কাছের রিট্যায়ার্ডের মাঠটাও দূরে চলে গেছে দশ বছর।

ফিরে তাকালে যতই কাছের মনে হোক, অঙ্ক বলছে অন্য কথা। সামনের দিকে তো আর নেই অনন্ত সময়।

এবার শীত জাঁকিয়ে পড়বে, সন্দেহ নেই। বিষকামড় দিতে চায় এখনই। সবে নভেম্বর।

মনে হয় সামনেই স্কুল ফাইনালের পরীক্ষা।

শীতের বিরুদ্ধে প্রবল বিদ্রোহাত্মক দৃঢ়তায় হাঁটছেন এক সত্তোরোর্ধ বৃদ্ধ।

ছেলে উলের সোয়েটার এনে দিয়েছে। ভেতরে উলিকট। গলায় মাফলার। মাথায় মাঙ্কি টুপি। সেও প্রচণ্ড গরম।
কান সহ্য করতে পারে না একটু হাঁটলেই।

বৃদ্ধ হাঁটার অভ্যাসটি রেখেছেন নিয়মিত। জুতো জোড়াও বেশ নরম।

সারা শহর জুড়ে পথবাতি গুলো জ্বলছে। গাড়িগুলোও ছুটোছুটি করছে। মানুষ গুলো যেন যুদ্ধ থেকে ফিরে আসছে। কারও হাতের থলেতে ফলমূল। কোনও একটি মেয়ের উচ্চকিত হাসি। কোনও একটি লোক কাঁধ কুঁজো করে সাইকেলের প্যাডেল ঘোরাচ্ছে। দ্রুত চলে যাচ্ছে বাইক পাশ দিয়ে অ্যাম্বুলেন্সের মতো।
দরকষাকষি হচ্ছে ফুটপাতে।

সত্তোরোর্ধ এই বৃদ্ধ একা হাঁটছেন কেন কেউ জানে না।
কোনও কাজ নেই শহরে। নেই কোনও কেনাকাটারও দায়ভার। তবুও।

পথে কেউ কথা বলছে না।
কেউ নজরই দিচ্ছে না তাঁর দিকে।
তবে, হ্যাঁ,
হাবুল, বীরেনরা হয়তো দেখে থাকবে,
–কথা না শুনলে কেমন হয়?

–দ্যাখো শুধু হাঁটুর ব্যথার অজুহাত দিয়ে, ঘরে বসে, বৌকে দিয়ে চা করিয়ে খাওয়া?

শীতকে জব্দ করতেই হবে।
ভয় পেলে চলবে না।

‘লেখকদের লেখক’ কমলকুমার, সাহিত্যেও করতেন ‘এক্সপেরিমেন্ট’

Kamal Kumar Majumdar

বিশেষ প্রতিবেদন: তাঁকে বলা হয় ‘লেখকদের লেখক’। তাঁর উপন্যাস ‘অন্তর্জলী যাত্রা’ এর অনন্যপূর্ব আখ্যানভাগ ও ভাষাশৈলীর জন্য প্রসিদ্ধ। বাঙলা কথাসাহিত্য বিশেষ করে উপন্যাস ইয়োরোপীয় উপন্যাসের আদলে গড়ে উঠছিল, কমলকুমার মজুমদার সেই পথ ত্যাগ করেছিলেন। তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যের দুরূহতম লেখকদের একজন। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য বিখ্যাত ছিলেন। তিনি কথাসাহিত্যিক ও শিল্পী কমলকুমার মজুমদার।

তিনি উত্তর চব্বিশ পরগনার জেলার, টাকি শহরে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা-প্রফুল্লকুমার মজুমদার এবং মাতা- রেণুকাদেবী। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি বিভিন্ন স্থানে কর্মরত ছিলেন। উল্লেখযোগ্য ভাবে, বাংলা সরকারের জনগণনা বিভাগ, গ্রামীন শিল্প ও কারুশিল্প, ললিতকলা একাডেমি এবং সাউথ পয়েন্ট স্কুলে। এছাড়াও তিনি ছবি, নাটক, কাঠের কাজ, ছোটদের আঁকা শেখানো, ব্যালেনৃত্যের পরিকল্পনা, চিত্রনাট্য রচনা করেন। বিভিন্ন পত্রিকায় তাঁর লেখা সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়।

রাধাপ্রসাদবাবু বলতেন, “কমলবাবুর পাণ্ডিত্য যখন-তখন অবাক করে দেবার মতো। কিন্তু সেটা তিনি দেখাতেন না, কথায় কথায় ধরা পড়ত। একটা সেন্স অব হিউমারে সব মুড়ে রাখতেন। একবার হল কী, এক ফড়ফড়ে আঁতেল এসে হাজির কফি হাউজে। নতুন নতুন কী সব বইপত্তর নিয়ে বেজায় বকছে। সদ্য প্রকাশ হওয়া কোন এক আর্ট থিওরির বইয়ের নাম করে বললে, “সে কী, এ বই না পড়া থাকলে তো তিরিশ বছর পিছিয়ে আছেন?”

Kamal Kumar Majumdar

“হঠাৎ বহু ক্ষণ চুপ থাকা কমলবাবু বললেন, ‘আপনার কি অ্যারিস্টটলের ‘পোয়েটিক্স’ পড়া আছে? আঁতেল মাথা নাড়ল, “না, ওটা পড়া নেই।” তাতে ‘এ হে হে’ করে উঠলেন কমলবাবু। বললেন, “তাহলে তো আড়াই হাজার বছর পিছিয়ে গেলেন মোহায়! আঁতেল চুপ।” একদিন বিক্রমনের সঙ্গে বসেছি কমলকুমারের কাছে। এ কথা, সে কথায় বিক্রমন জিজ্ঞেস করলেন, “এত কঠিন করে লেখেন কেন?’ একটু হেসে বললেন, “বলা কঠিন।” তারপর একটু থেমে বললেন, “আমার যে খুব সহজ, তরতরে লেখা পড়তেও কষ্ট হয়, হোঁচট খাই।” বিক্রমন জিজ্ঞেস করলেন, “আপনার লেখাকে কি বঙ্কিমী ধারায় বলা যাবে?”

কমলবাবু চুপ রইলেন কিছুক্ষণ, তারপর প্রশ্ন করলেন, “আপনারা কি মার্শাল প্রুস্তের ‘পুরানো সময়ের সন্ধানে’ (ঠিক এই ভাবেই উনি ‘রিমেমব্রেন্স অব থিংগজ পাস্ট’-এর উল্লেখ করেছিলেন) উপন্যাসটির কিছুটাও কি পড়েছেন?” বিক্রমন ও আমি সমস্বরে বললাম, ‘শুধু প্রথম খণ্ড ‘সোয়ানজ ওয়ে’।

কমলবাবু হেসে বললেন, “বাকি সব খণ্ডেও কিন্তু সেই স্মৃতি, স্মৃতি আর স্মৃতি। কখনও কি মনে হয় এত স্মৃতি কি ধরে রাখা যায়? আর এও কি মনে হয়, কীসের প্রভাবে এত কিছু একই মনে ঘর করে? এ সবই শব্দ, বাক্য, সাহিত্যের ইন্দ্রজাল।”

তবে ওঁর প্রথম, প্রধান, অতুলনীয় উপন্যাস ‘অন্তর্জলী যাত্রা’-র শুরু থেকে শেষ যে শ্মশানঘাটে তার প্রথম অনুচ্ছেদটি যেন বিভাস রাগিণীর আলাপসুর। কমলকুমার লিখছেন…“আলো ক্রমে আসিতেছে। এ নভোমণ্ডল মুক্তাফলের ছায়াবৎ হিম নীলাভ। আর অল্পকাল গত হইলে রক্তিমতা প্রভাব বিস্তার করিবে, পূনর্ব্বার আমরা, প্রাকৃতজনেরা, পুষ্পের উষ্ণতা চিহ্নিত হইব। ক্রমে আলো আসিতেছে।” আলো ফুটছে শ্মশানে, যেখানে অশীতিপর সীতারাম চট্টোপাধ্যায়কে অন্তর্জলী যাত্রার জন্য আনা হয়েছে। সেখানে তাঁর সঙ্গে ‘অনিন্দ্যসুন্দর একটি সালঙ্কারা কন্যা’ যশোবতীর বিবাহদানও হল।

<

p style=”text-align: justify;”>লেখাতে কন্যাকে বর্ণনা করেছেন ‘ক্রন্দনের ফলে অনেক স্থানের চন্দন মুছিয়াছে, আকর্ণবিস্তৃত লোচন রক্তাভ, হলুদ প্রলেপে মুখমণ্ডল ঈষৎ স্বর্ণসবুজ। সর্ব্বলক্ষণে দেবীভাব বর্ত্তমান, ফলে সহজেই মনে হইবে এ যেন বা চম্পক ঈশ্বরী, লক্ষ্মী প্রতিমা। শুধুমাত্র মুখখানি জন্ম দুঃখিনীর মতই বিষাদময়।’ এক সময় বৃদ্ধের সঙ্গে যশোবতীর বিবাহ দিয়ে দুজনকে শ্মশানে রেখে চলে গেল সবাই। আশা পর দিন ফেরত এসে বৃদ্ধের মৃত্যু দেখে তাঁর সৎকার ও যশোবতীর সতীদাহ সম্পন্ন করা যাবে। মন মানে না শুধু বৈজু চাঁড়ালের, যার কাজ হবে মড়া পোড়ানো ও সতীকে দাহ করা। সে কেবলই স্বামীর শরীর পাহারা দেওয়া নববধূর কাছে যায় আর বলে, ‘তুমি পুড়বে চচ্চড় করে …ভাবতে আমার চাঁড়ালের বুক ফাটে গো। তুমি পালাও না কেনে।’

এ সপ্তাহের গল্প: দীপ শেখর চক্রবর্তী

সুলতার ফুলছাপ সায়া

দুপুরবেলা জ্যোতির্ময় টেলিফোন করে জানালো স্যার আর নেই। আত্মহত্যা।

আত্মহত্যা!

সারা দুপুর এমন বৃষ্টি হল যেন পৃথিবী ভেসে যাবে। আমাদের বারান্দার শেষ দুটো সিঁড় জলের তলায় চলে গেছে। দেওয়ালের দিক থেকে চুইয়ে চুইয়ে জল পড়ছে। এমন বৃষ্টির মধ্যে আর স্যারের ঘাড় ভাঙা নিস্প্রাণ দেহটা দেখতে যেতে ইচ্ছে করল না। বৃষ্টি না হলে কী হত সেটা বলা শক্ত। তবে আমার যাওয়ার বিশেষ ইচ্ছে ছিল না। ফলে বিকেলবেলা যখন জ্যোতির্ময় আবার ফোন করল তখন না যাওয়ার একটা অজুহাত হয়ে উঠল বৃষ্টি।

এমন বৃষ্টির দিনে চলে যাওয়ার কথা কী ভাবা যায়?

স্যারের কাছে আমি যবে অঙ্ক করা শিখতে যাই তার অনেক আগে থেকেই ওর সঙ্গে বাবার যোগাযোগ। বাবার ব্যাঙ্কেই একটা ঋণ নেওয়ার সূত্র ধরে পরিচয়। বাবার জন্যই সেটা পাওয়া সম্ভব হয়েছিল। আমার বাড়ি থেকে স্যারের বাড়ির দূরত্ব বেশি নয়। মাঝে-মধ্যেই সকালের বাজার করে আমাদের বাড়িতে চায়ের আড্ডায় চলে আসত। তখন আমি প্রাথমিক স্কুলের গণ্ডি টপকাতে পারিনি। তখনও জানতাম না, মানুষটি একদিন আমার অঙ্ক স্যার হবে।

দূর থেকে মানুষটিকে খুব আমুদে মনে হত। নানারকম কথায় মাতিয়ে রাখত চায়ের আড্ডাটা। বহুক্ষণ কেটে যাওয়ার পর আচমকা নিজেকে নিজে তাড়া দিয়ে দ্রুত বেরিয়ে যেত। আর একটাও কথা বলত না।

অঙ্ক করতে গেলাম যখন তখনও মানুষটা একইরকম। জ্যোতির্ময় এই অঙ্ক ব্যাচেরই সহপাঠী।

সেদিন দুপুরবেলা জ্যোতির্ময়ের মুখ থেকেই শুনলাম আমাদের অঙ্ক শেখানোর স্যার আত্মহত্যা করেছে। আত্মহত্যা মানে জীবনের অঙ্কগুলো ঠিকমতো মেলাতে পারেননি ? নাহ, এভাবে ঘটনার খুব সরলীকরণ হয়ে যাবে।

বিকেলবেলা ঘটনাস্থলে না গেলেও মাথা থেকে বিষয়টা মুছে ফেলতে পারলাম না। স্যার কখনও আত্মহত্যা করতে পারে? জ্যোতির্ময় কীভাবে ঘটনাটা জানলো সে-কথাও জিজ্ঞেস করে ওঠা হয়নি। শুধু আত্মহত্যার কথা শুনে নীরবে ফোন রেখে দিয়েছি। এমনকি বিকেলবেলা যখন ও আবার ফোন করেছিল তখনও বিশেষ কোনও কথা হল না। শুধু জানিয়ে দিলাম, এমন বৃষ্টির মধ্যে যাওয়া কঠিন।

বিকেলবেলা দোতলার ঘর থেকে পুরনো অঙ্ক খাতাগুলো নামিয়ে আনতে গেলাম। অনেক খুঁজে স্যারের খাতাগুলো খুঁজে পেলাম। এই খুঁজে পাওয়ার ক্ষেত্রে খুবই সাহায্য করেছে মলাটের ওপর লিখে রাখা নাম।

স্যারের অঙ্ক খাতা

যা আশা করেছিলাম তাই। খাতার ভেতরে একটা কিছু আর লেখা নেই। সমস্ত অঙ্কগুলো অদৃশ্য হয়ে গেছে। স্যার নিজের শেখানো অঙ্কগুলো নিজের সঙ্গে করে নিয়ে গেছেন, বেশ বুঝলাম। ঠিক তক্ষুনি একটা ভয় হল আমার। পাগলের মতো পুরোনো শংসাপত্রগুলো বের করলাম।

আমি যা আশঙ্কা করছি তা যদি ঠিক হয় তবে তো মহাবিপদ।

ঠিক তাই হল। প্রতিটি অঙ্কের নম্বরের নীচে একটা লাল দাগ। সব শূন্য। স্যার শুধু অঙ্কগুলো নয়, তার সঙ্গে সঙ্গে আমাকে শেখানো অঙ্কের সব পদ্ধতিগুলো নিয়ে আত্মহত্যা করেছে।

এখন উপায় কী সেই নিয়ে কোনও ভাবনাই মাথায় এল না। আমার গোটা জীবনের সমস্ত অঙ্ক খাতাই একটা করে লাল দাগে ভরে গেছে। জীবনের প্রতিটি হিসেবেই এখন আমি অকৃতকার্য। কিছু সময় পর হয়ত এই নিয়ে একটা তোলপাড় হবে। কী কী কেড়ে নেওয়া হবে আমার থেকে তার একটা সম্ভাব্য হিসেব করে রাখলাম। দেখা গেল, কিছুই প্রায় অবশিষ্ট রইল না।

সন্ধের দিকে বৃষ্টি ধরে গেল। কোল ভর্তি ফাঁকা খাতা নিয়ে দম বন্ধ হয়ে আসছিল আমার। বেরিয়ে পড়লাম। ছায়াবাণী সিনেমা হলের কাছে চায়ের দোকানে চা খাচ্ছি, রজতের সঙ্গে দেখা। রজতও স্যারের কাছে পড়া আমার সহপাঠী।

-স্যার আর নেই।

এই নিয়ে দ্বিতীয়বার স্যারের না থাকার কথা শুনলাম। প্রথমবার শুনে যতটা অসম্ভব লেগেছিল এখন ততটা লাগল না। এভাবেই মৃত্যু সয়ে যায়।

-স্যার যে আত্মহত্যা করতে পারে এ কথা ভাবতে পারি না।

আমার কথা শুনে আশ্চর্য হয়ে গেল রজত। তারপর গম্ভীর ভাবে বলল –

-স্যার আত্মহত্যা করেনি দীপ। দুর্ঘটনায় মারা গেছেন।

দুর্ঘটনা! তবে জ্যোতির্ময় যে বলল স্যার আত্মহত্যা করেছে।

জ্যোতির্ময় কিচ্ছু জানে না। হয়ত, রজতও না। ছায়াবাণী সিনেমাহল পেরিয়ে যখন স্টেডিয়ামের পাশের পথ দিয়ে হাঁটছি মনে হল মৃত্যু সম্পর্কে আমরা কতটুকুই বা জানি। কীভাবে দুর্ঘটনা ঘটল, কেন ঘটল সেসব সম্পর্কে কিছুই আমি জিজ্ঞেস করিনি রজত কে। জিজ্ঞেস করে লাভ? তবে অদ্ভুত লাগল যখন রজত একটি পুরনো ঘটনার কথা মনে করিয়ে দিল।

তোর মনে আছে পড়াতে বসে স্যার কেমন মাঝে মাঝে গা হাত পা টেপাতো মেয়েদের দিয়ে?

আচমকা মনে পড়ে গেল ঘটনাটা। সেই তো, অদ্ভুত! কথাটা আজ শুনে কেমন গা ঘিনঘিন করে উঠল। তবে এতদিন চোখের সামনে দেখেছি, কিছুই তো মনে হয়নি। বরং তা এক পিতৃতুল্য মানুষের প্রতি মেয়েদের সেবা হিসেবেই দেখেছি। তবে কি আমাদের মন অনেক বেশি বিষিয়ে গেছে ?

কথাটা বলে রজত কদর্য হাসলো। ঠিক সেই মুহূর্তে রজতকে বেশি ঘৃণা করেছিলাম নাকি সদ্য মৃত স্যারকে ঠিক তুলনা করতে পারলাম না।তারপর সেই তুলনা করতে না পারাটাকে নিজের মুখের ভেতর তেতো একটা স্বাদ করে এগিয়ে গেলাম স্টেডিয়ামের রাস্তায়।

রাত্রিবেলা একটা ছোট্ট সাদা ওষুধ খাই। উদ্বেগ কমানোর ওষুধ।

তবে স্যারকে নিয়ে চিন্তা মনটাকে অস্থির করে তুলেছে। স্যারের মৃত্যু, সেটা কি আত্মহত্যা নাকি একটি দুর্ঘটনা। কিন্তু তাতেই বা কী যায় আসে? আমি ভাবছি আমার সমস্ত কীর্তি থেকে অঙ্কের নম্বরগুলো উধাও হয়ে গেছে। ফলে, এখন সমস্ত কিছুতেই আমি অকৃতকার্য। কাল কী রাষ্ট্র এসে আমাকে দেওয়া সমস্ত শংসাপত্র কেড়ে নিয়ে চলে যাবে?

তাহলে আমার পরিচয় কী হবে? এত এত বছর যে কাগজগুলো অর্জন করার জন্য সমস্ত দিয়ে দিয়েছি? সমস্তকিছুই এক মুহূর্তে মূল্যহীন হয়ে গেল? আমার অস্তিত্ব? কাল থেকে কি নতুন করে আমাকে অঙ্ক শিখতে হবে? শুয়ে শুয়ে ছোটবেলায় শেখা অঙ্কের সুত্রগুলো হাতড়াই। বারবার যোগ করে দেখি, দুই যোগ দুই কত? চার, চার, চার আর গতবার বলব?

চার!

এই শালা শুয়োরের বাচ্চা

স্বপ্নের ভেতর নাকি বাস্তবে কেউ গালাগাল করল, ঠিক বুঝতে পারলাম না। আশ্চর্য স্বপ্ন দেখছিলাম স্যার সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে বসে আছে আমাদের বাথরুমে। তার হাত পা টিপে দিচ্ছে আমার প্রাক্তন প্রেমিকারা। সর্বাঙ্গে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। এই গোটা দৃশ্যটা আমরা দেখছি, বাড়ির সেই পুরোনো বড় শাটার টিভিটায়। যেখানে মাঝে মাঝেই ইঁদুর দৌড়ে যেত। বিকেলবেলা যেখানে দেখা হত ‘ জন্মভূমি ’ নামক ধারাবাহিকটি। সেই টিভিতে স্যারের নগ্ন হয়ে স্নান করানোর দৃশ্য। আচমকা তা মুছে গিয়ে জ্যোতি বসুর মুখ ভেসে উঠল। জ্যোতি বসু আমাদের সে সময়ের একমাত্র ঈশ্বর। কামান দাগার মতো করে গুড়ুম আওয়াজ হল কোথায় আর স্বপ্নের ভেতর নাকি বাস্তবে কে চিৎকার করে আমাকে গালাগাল করল-

এই শালা শুয়োরের বাচ্চা।

ধড়ফড় করে জেগে উঠে বাথরুমে গেলাম। তারপর দাঁত মাজতে মাজতে আরেকবার গিয়ে বসলাম বের করে আনা অঙ্ক খাতাগুলোর কাছে। না, এখনও খাতাগুলো ঝকঝকে পরিষ্কার। স্যার আমার সর্বনাশ করে দিয়ে গেল।

শালা মেয়েবাজ লম্পট মাল একটা।

কাগজপত্র ঘাটতে ঘাটতে এল মেঘার টেলিফোন।

-দীপ, স্যার নাকি খুন হয়েছে?

এই নিয়ে তৃতীয় বার স্যারের মৃত্যু নতুন করে আমার সামনে এল। কিন্তু মেঘা কীভাবে স্যারকে চেনে? ও তো আমাদের আমাদের সঙ্গে অঙ্ক করত না? মেঘা কোনও উত্তর দিল না। মনে হল কিছু একটা যেন চেপে গেল মেঘা।

তাহলে কি আমার জীবনের অঙ্ক না মেলার ঘটনাটা মেঘার থেকেই শুরু হল?

কিন্তু স্যারের মৃত্যু সম্পর্কে এই তৃতীয় তথ্যটা আমার বিশ্বাস হল না। খুন! যদিও তৃতীয় বারেও সেই সম্পর্কিত বিস্তারিত আমি জানতে চাইলাম না মেঘার কাছে।

আত্মহত্যা – দুর্ঘটনা – খুন

সমস্তটা যদি একটা ব্রাকেটে রেখে দেওয়া যায় তবে সূত্রটা হয় –

( আত্মহত্যা + দুর্ঘটনা + খুন ) = একটি মৃত্যু

দুপুরবেলা কাউকে না জানিয়ে গেলাম মাখন সাহার পুকুরের কাছে। স্যারের মৃত্যু সংবাদের চব্বিশ ঘন্টা কেটে গেছে। দম বন্ধ হয়ে আসছিল। একটু খোলা জায়গায় যাওয়ার দরকার। চাষের জমিটাকে দেখলাম পাঁচিল দিয়ে ঘিরে দিয়েছে। জিজ্ঞেস করলাম, এখানে কী হচ্ছে?

-যা চাষের থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

-মানে ?

-বলুন, জয় শ্রী…

কিছুদূর গেলেই সেলিম আলির বাড়ি। আমাদের বাড়িতে রোজ তরকারি দিতে আসত। একদিনের পর আর এল না।

কেন এল না সে প্রসঙ্গ তোলা আমাদের বাড়িতে একপ্রকার নিষিদ্ধ।

মাখন সাহার পুকুরের কাছে পুরোনো ইটখোলার ঢিবি। তার ওপরে একটা শিমুল তুলোর গাছ। বহুদিনের পুরোনো গাছ। মালাবার সিল্ক কটন। ফুলে ফুলে লাল হয়ে থাকে। এখানেই কতদিন রাতের বেলা শুয়ে থেকেছি কাউকে কিছুই না জানিয়ে।

একা একা কী আর শুয়েছি?

কতটা হুরেরা এসে শুয়েছে আমার পাশে।

হুর !

কুরআন সম্পর্কে তাফসির ও ব্যাক্যাসমূহে, হুরের নিন্মরূপ বর্ণনা রয়েছে –

১। কুমারী

২। বড় ও সুন্দর চক্ষুধারী

৩। তেত্রিশ বছর বয়স

৪। সুন্দর রঙ

৫। কোন জিন ও মানব পূর্বে যাদের ব্যবহার করেনি

৬। ইত্যাদি ইত্যাদি…

সাদা তুলো আমাদের শরীরের ওপর এসে কতদিন পড়েছে। সবই স্যারের শেখানো অঙ্কে। তবে আজ সেসব যেন মুছে গেছে পৃথিবী থেকে। একটা ফ্যাকাশে মেঘলা দিন এবং অসম্ভব অবসাদগ্রস্ত হয়ে বহুক্ষণ বসে রইলাম ঢিবির ওপরে। ভাবলাম – হুরেরা ইস্কুল, চাকরি করতে যাবে তবে আমি আর চায়ের দোকানে বা রেস্তোরাঁতে বসে তাদের জন্য অপেক্ষা করতে পারব না। সেই সর্বনাশটাই হয়ে গেল।

আমার কাগজপত্র সমস্তই বাজেয়াপ্ত হবে কিছুদিন পর। সমস্ত শংসাপত্র কেড়ে নেওয়া হবে। তারপর পরিচয়হীন একটা জঞ্জালের মতো আমি এই পৃথিবীতে রয়ে যাব। স্যার নিজের শেখানো সমস্ত অঙ্ক নিয়ে এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে।

 

বাড়ি ফেরার পর বাবা দু’টো কথা বলল। ততক্ষণে জ্যোতির্ময়ের প্রথম খবর দেওয়ার চব্বিশ ঘন্টা অতিক্রান্ত।

এক, স্যার নাকি হঠাৎ বাড়ি নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে।

দুই, একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটে চলেছে বার্মা কলোনিতে।

 

স্যারকে নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন খবর শুনতে শুনতে আমার এখন সমস্তটাই সয়ে গেছে। নিরুদ্দেশ হওয়ার ঘটনাটা আমাকে তেমনভাবে আর নাড়া দিল না। মনে মনে আমি একটা অঙ্ক কষে নিলাম।

( আত্মহত্যা + দুর্ঘটনা + খুন ) = মৃত্যু / নিরুদ্দেশ

 

যদিও মৃত্যু ও নিরুদ্দেশ এক কথা নয়। তবে আমার স্বার্থের দিক থেকে দেখলে দু’টোর মধ্যে কোনও তফাৎ নেই।

 

দ্বিতীয় ঘটনাটির প্রসঙ্গে আসি। একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটে চলেছে বার্মা কলোনিতে। সেখানে একটা ছোট খাল রয়েছে যা এককালে ভয়ানক নদী ছিল। প্রবল বন্যা হত সেই নদীতে। তবে মূল স্রোতের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় বহু বছর ধরে তা খাল। সেই খালের পাশেই জমিতে এককালে বার্মা থেকে আসা উদ্বাস্তুদের বসিয়েছিলেন রাজীব গান্ধী। এভাবেই বার্মা কলোনি গড়ে উঠেছিল।

এই খাল যা এককালে নদী ছিল তার আশেপাশেই শুরু হয়েছে বিশাল ভাঙন। নদী যেন তার পুরনো রূপ আবার ফিরে পাচ্ছে। একে একে সমস্ত চলে যাচ্ছে নদীর পেটে। পৌরসভা কিছুই করতে পারবে না বলে হাত তুলে ফেলেছে ইতিমধ্যে।

আমার চিন্তা হল। এই বার্মা কলোনিতেই তো সুলতাদের বাড়ি।

সুলতা, আমার মাঝেমাঝেই রাত্রিবাসের একমাত্র ঠিকানা। ওর বাড়িটাকে বাড়ি না বলে ঝুপড়ি বলাই ভালো। তবে একটা পোক্ত টিনের চাল রয়েছে। রাতের বেলা বৃষ্টি হলে সেই টিনের চাল যেন ঝমঝম করে নাচে। সুলতার বয়েস তেত্রিশ।

সুলতার সব ভালো শুধু দু’টো বিষয় আমার একদম ভালো লাগে না।

এক, সুলতা ওর ফুলফুল সবুজ সায়াটা একদম ছাড়তে চায় না। রাতের পর রাত পরে থাকে।

দুই, মাঝে মাঝেই ওর বিরক্তিকর স্বপ্নটার কথা আমাকে শোনায়। অদ্ভুত একটা পাখি নাকি স্বপ্নের ভেতর ওর স্তন ঠোকরায়। স্বপ্নের ভেতর এসব ঢ্যামনামো আমার একদম সহ্য হয় না।

তবুও সুলতাকে আমার পছন্দ। আমাকে ওর বাড়িতে আশ্রয় দেওয়ার জন্য কখনোই ও শংসাপত্র দেখতে চায়নি। আমার অঙ্কের নম্বর দেখতে চায়নি। এই কালই যদি আমার কিচ্ছু না থাকে তাহলে বাড়িতে আশ্রয় পাব কিনা জানি না তবে আমি ঠিক জানি, সুলতাই আমাকে আশ্রয় দেবে।

 

সন্ধেবেলা বেরিয়ে গেলাম বার্মা কলোনির পরিস্থিতি দেখতে। দেখলাম আমাদের ছোট শহরের খালটি বিরাট রাক্ষসের মতো আকার ধারণ করেছে। দুদিকের প্রায় সব বাড়িই ওর পেটের ভেতর গেছে ঢুকে। পুলিশ লম্বা ব্যারিকেড করে রেখেছে। এদিকে পৌরসভার লোক, ইঞ্জিনিয়ার, ভূতত্ত্ববিদ সবাই সঙের মতো দাঁড়িয়ে দেখছে ধ্বংসলীলা। সেই ভিড়ের মধ্যে আমি সুলতার ঘরটা খুঁজতে লাগলাম। নাহ, আশ্চর্য ভাবে বেঁচে গেছে সুলতার ঘরটা। অদ্ভুত ,অলৌকিক যেন এই বাঁচা।

আচমকা উপস্থিত জনতার মধ্যে একটা শোরগোল ওঠে। দেখি ভিড় ঠেলে, পুলিশ ঠেলে, পৌরসভার লোক, ইঞ্জিনিয়ার, ভূতত্ত্ববিদ সবাইকে ঠেলে উপস্থিত হল একজন লম্বা চুলের লোক। শরীরে তার আশ্চর্য দ্যুতি। মাথার পেছন আলো হয়ে আছে। তার পরনে শুধু একটা সাদা রঙের ধুতি। কপালে চন্দন টিকা। সবাই ঠাকুর ঠাকুর করে চিৎকার করে উঠল।

লোকটি গেল নদীর সামনে। তারপর চোখ বুজে যেই হাত তুলল , এতক্ষণের রাক্ষুসে নদী যেন ছোট্ট বাচ্চাটি হয়ে বসে পড়ল মাটিতে।

ভিড়ের মধ্যে চিৎকার আরও বাড়তে লাগল। জয়ধ্বনি…

তারপর যে দেখলাম সেই লম্বা চুলের পুরুষ ধীর পায়ে এগিয়ে গেল সুলতাদের বাড়ির দিকে। দুটো টোকা দিতেই খুলে গেল দরজা। ঢুকে গেল লোকটি ভেতরে।

দেখলাম বাইরের তারে ঝুলে আছে সুলতার বহু ব্যবহৃত ফুল ছাপ সবুজ সায়াটা।

ডাকাত কালীর সঙ্গে জড়িয়ে হাড় হিম করা গল্প

The story of singur dakat kali

Special Correspondent, Kolkata: ব্রহ্মযামল তন্ত্রের মতে, বাংলার অধিষ্ঠাত্রী হলেন দেবী কালিকা। এই কারণেই, বহু প্রাচীনকাল থেকে বঙ্গদেশে কালীর সাধনা শুরু হয়। গড়ে ওঠে বিখ্যাত কালী মন্দির গুলি। ডাকাতে কালীর নাম শোনেনি এমন বাঙ্গালী নেই। গল্প পড়ে বাঙালি জেনেছে, ডাকাতরা কালী সাধক হন।

বঙ্গদেশে এমন কোনও ডাকাতের কাহিনী প্রচলিত নেই যিনি কালীপুজো করতেন না। তাঁরা নাকি কালীর খাঁড়া থেকে প্রসাদী সিঁদুর নিয়ে কপালে তিলক কেটে ডাকাতি করতে বের হতেন। সেইসব পুজোয় নরবলি ও নাকি হত।পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার সিঙ্গুর নামক স্থানের নিকট পুরুষোত্তমপুর এ অবস্থিত সিঙ্গুরের ডাকাত কালীমন্দির একটি বিখ্যাত কালীমন্দির। সিঙ্গুরে ডাকাত কালীমন্দির এর প্রতিষ্ঠাকাল সম্বন্ধে জানা যায় না।

কিন্তু সিঙ্গুরের কালীপুজোর সঙ্গে কোথায় যেন মিশে রয়েছে হাড় হিম করা ডাকাতদের কাহিনী। সিঙ্গুরের ডাকাত কালীমন্দির সেরকমই একটি মিথ।স্থানীয়রা এই ডাকাত কালী কে এতটাই জাগ্রত বলে মনে করেন যে আশেপাশের তিনটি গ্রামে হয় না কোনও কালীপুজো। মূর্তি তো দূরের কথা গ্রামের কোন বাড়িতে মা কালীর ছবি লাগানো ক্যালেন্ডার ও টাঙ্গানো হয়না।

 

মূলত এই মন্দির ডাকাত সনাতন বাগদী না গগন সদ্দার নির্মাণ করেছিলেন তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। আটচালা মন্দিরের দেওয়ালে বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি, বিষ্ণুর দশাবতারের মূর্তি ও পোড়ামাটির লতাপাতা খোদিত রয়েছে। মন্দিরের গর্ভগৃহের প্রায় নয় ফুট উচ্চ বিগ্রহ অবস্থিত। গর্ভগৃহে ঢোকার একটিই প্রবেশদ্বার। আগে মন্দিরের সামনের দিকে টেরাকোটা অলংকরণে অলংকৃত ছিল। কিন্তু এখন সেই টেরাকোটার সামান্যই অবশিষ্ট আছে। মন্দিরের সামনে চাঁদনী আকৃতির নাটমন্দির আছে। মন্দির চত্বর পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। এই মন্দিরে কালি সিদ্ধেশ্বরী নামে বিখ্যাত।

কথিত আছে প্রায় ৫০০ থেকে ৫৫০ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত হয় সিঙ্গুরের ডাকাত কালী মন্দিরের। এই প্রাচীন কালী মন্দির প্রতিষ্ঠা নিয়ে বহু গল্প ছড়িয়ে আছে। রঘু অথবা গগন ডাকাত ঘট স্থাপন করে পুজো শুরু করে। তখন ঘট পুজোয় হত, মন্দির ছিল না। অতীতে সেই সময় এখানে এক গভীর জঙ্গল ছিল। অসুস্থ ঠাকুর রামকৃষ্ণ কে দেখতে মা সারদা কামারপুকুর থেকে দক্ষিণেশ্বর যাচ্ছিলেন। সেই সময় রঘু ও গগন ডাকাত মায়ের পথ আটকে দাঁড়ায় ডাকাতির উদ্দেশ্যে। হঠাৎ করে সেই সময়ে মায়ের মুখ দেখতে পায় ডাকাতরা। ভুল বুঝতে পেরে তারা ক্ষমা চায় মা সারদার কাছে।

এই অলৌকিক ঘটনার ভীত হয়ে রঘু ও গগন ডাকাত এই স্থানে কালী মন্দির প্রতিষ্ঠা করে। বর্ধমানের মহারাজা মা কালীর স্বপ্নাদেশ পাওয়ার পড়ে প্রতিমা ও মন্দির নির্মিত হয়। অতীতে এখানে নরবলি হত এমনটাই জনশ্রুতি আছে। রাতে মা সারদা কে খেতে দেওয়া হয় চাল ও কড়াই ভাজা। সেই থেকে মায়ের প্রসাদ হিসেবে চাল–কড়াই ভাজাই দেওয়া হয়।মন্দির কমিটির সম্পাদক মদন কোলে বলেন, ডাকাতি কালীমন্দির ছাড়া মল্লিকপুরে, জামিনবেড়িয়া ও পুরুষোত্তমপুর এই তিন গ্রামে হয়না কোন ও কালীপুজো। এমনকি গ্রামের কারোর বাড়িতে নেই কোন কালীর মূর্তি ও। মা কালীর ছবি লাগানো ক্যালেন্ডার লাগানেরেও সাহস পান না স্থানীয়রা। এতটাই জাগ্রত সিঙ্গুরের ডাকাত কালীমন্দির। এই প্রতিমার পুজো ছাড়া অন্য প্রতিমার পুজো করতে সাহস পায় না এলাকার মানুষজন।

<

p style=”text-align: justify;”>ডাকাতরা চলে যাওয়ার পর স্বপ্নাদৃষ্ট হয়ে সিঙ্গুর থানার চালকেবাটির মোড়ালরা এই মন্দির নির্মাণ করেছেন। তাই কালীপুজোর দিন মোড়লদের পুজো আগে হয়। কোন প্রতিষ্ঠা ফলক না থাকায় মন্দির কবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তা সঠিকভাবে বলা যায় না। সম্ভবত অষ্টাদশ শতাব্দীতে মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয়। মন্দিরের বর্তমান সেবায়েত বৃন্দঃ স্বর্গীয় কৃষ্ণধন ব্যানার্জীর দুই পুত্র, স্বর্গীয় কালিপদ চট্টোপাধ্যায়ের দুই পুত্র ও স্বর্গীয় শংকর নাথ সিমলায় এর দুই পুত্র। এরাই পালাক্রমে পূজা কার্য সম্পাদন করেন। এছাড়া মন্দিরের উন্নয়নের জন্য আছে” ডাকাত কালীমন্দির উন্নয়ন কমিটি “।