রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া (RBI) আবারও রেপো রেট কমিয়ে ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়েছে, যা দেশের কোটি কোটি ঋণগ্রহীতার জন্য অত্যন্ত স্বস্তিদায়ক খবর। এই সিদ্ধান্তের ফলে হোম লোন, অটো লোন এবং পার্সোনাল লোন নেওয়া আরও সস্তা হবে। একইসঙ্গে, যারা ইতিমধ্যেই ঋণ নিয়েছেন, তাদের মাসিক EMI-ও কিছুটা হ্রাস পাবে।

বর্তমানে, এই নতুন রেপো রেট কেটে ৬ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে ৫.৫০ শতাংশ। এটি COVID-19 মহামারির পর RBI-র তৃতীয়বারের মতো সুদের হার হ্রাস করার সিদ্ধান্ত। ২০২০ সালের মে মাস থেকে ২০২২ সালের এপ্রিল পর্যন্ত রেপো রেট ছিল ৪ শতাংশ। এরপর ধাপে ধাপে ২০২২-এর এপ্রিল থেকে ২০২৩-এর ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই হার বাড়িয়ে ৬.৫ শতাংশে পৌঁছে যায়। গত দুই বছর এই হার অপরিবর্তিত রাখার পর এবার আবার তা কমানো হল।

হোম লোন EMI-তে সরাসরি প্রভাব
রেপো রেট কমানোর সরাসরি প্রভাব দেখা যাবে হোম লোন EMI-তে। ধরুন, আপনি HDFC ব্যাংক থেকে ৫০ লক্ষ টাকার হোম লোন নিয়েছেন ৩০ বছরের জন্য, ৮.৭০ শতাংশ সুদে।

  • বর্তমান EMI: ₹৩৯,১৩৬
  • নতুন সুদের হার (৮.২০%) অনুযায়ী EMI: ₹৩৭,৩৪৬
  • প্রতি মাসে সাশ্রয়: ₹১,৭৯০
  • বার্ষিক সাশ্রয়: ₹২১,৪৮০

যদিও মাসে ₹৯০০ থেকে ₹১৮০০-এর মতো সাশ্রয় শুনতে সামান্য মনে হতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে অর্থাৎ ৩০ বছরের ঋণ মেয়াদে এই ছোট ছোট সাশ্রয় কয়েক লক্ষ টাকায় পৌঁছে যায়। এটি একটি বাস্তবিক এবং গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক স্বস্তি।

পার্সোনাল লোন EMI-তেও সাশ্রয়:
একই প্রভাব দেখা যাবে পার্সোনাল লোন EMI-তেও। ধরুন, ৫ লক্ষ টাকার একটি পার্সোনাল লোন নেওয়া হয়েছে ১২ শতাংশ সুদে ৫ বছরের জন্য।

  • বর্তমান EMI: ₹১১,১২২
  • নতুন সুদের হার (১১.৫০%) অনুযায়ী EMI: ₹১০,৯৬৩
  • প্রতি মাসে সাশ্রয়: ₹১৫৯
  • বার্ষিক সাশ্রয়: ₹১,৯০৮

যদিও পার্সোনাল লোনে EMI সাশ্রয় হোম লোনের তুলনায় তুলনামূলকভাবে কম, তবুও এটি ঋণগ্রহীতার সামগ্রিক বাজেট ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

ব্যাংক কীভাবে রেপো রেট কাটকে কার্যকর করবে?
এই EMI সাশ্রয় কিন্তু পুরোপুরি নিশ্চিত নয়, কারণ প্রতিটি ব্যাংক তাদের নিজস্ব প্রক্রিয়ায় রেপো রেট কমানোর প্রভাব গ্রাহকের ওপর প্রয়োগ করে। ঋণের সুদের হার মূলত দুটি অংশে বিভক্ত— MCLR (Marginal Cost of Funds based Lending Rate) এবং স্প্রেড।

RBI যখন রেপো রেট কমায়, তখন ব্যাংকগুলোর MCLR কমার সম্ভাবনা থাকে, কারণ তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে কম হারে ঋণ নিতে পারে। তবে স্প্রেড বা মার্জিনটি প্রত্যেক ব্যাংকের নিজস্ব নীতি অনুসারে নির্ধারিত হয়, এবং এখানেই ভিন্নতা দেখা দিতে পারে। কিছু ব্যাংক সম্পূর্ণ রেপো রেট কাটের সুবিধা গ্রাহকদের দেয়, আবার কিছু ব্যাংক সীমিত পরিমাণে ছাড় দেয়।

নতুন ঋণগ্রহীতাদের জন্য সুখবর
যারা বর্তমানে হোম, অটো বা পার্সোনাল লোন নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন, তাদের জন্য এই রেপো রেট হ্রাস একটি সুবর্ণ সুযোগ। সুদের হার কম হওয়ায় তাদের ঋণের EMI তুলনামূলকভাবে কম থাকবে, যা তাদের ঋণ গ্রহণের সিদ্ধান্তকে আরও সহজতর করে তুলবে। এর ফলে রিয়েল এস্টেট, অটোমোবাইল এবং কনজিউমার ডিউরেবল পণ্য খাতে চাহিদা বাড়তে পারে।

কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা?
অর্থনীতিবিদদের মতে, RBI-র এই পদক্ষেপ ভারতের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার একটি প্রয়াস। ঋণের খরচ কমলে ভোক্তারা আরও বেশি খরচ করতে পারবেন, যার ফলে বাজারে লেনদেন বাড়বে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক গতি ফিরে আসবে।

তবে বিশেষজ্ঞরা এটাও বলছেন, EMI-তে সুবিধা পেতে হলে গ্রাহকদের তাদের ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে হবে তারা কতটা রেপো রেট কাটের সুবিধা পেয়েছেন। অনেক সময় ব্যাংকগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সুদের হার হ্রাস করে না, গ্রাহকদের আবেদন করতে হতে পারে।

RBI-র সাম্প্রতিক রেপো রেট কমানোর সিদ্ধান্ত দেশের ঋণগ্রহীতাদের জন্য এক বড় স্বস্তির নিঃশ্বাস। হোম ও পার্সোনাল লোনের ক্ষেত্রে EMI কমে যাওয়া মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের মাসিক বাজেট পরিচালনায় সাহায্য করবে। যদিও চূড়ান্ত EMI সাশ্রয় নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সিদ্ধান্তের ওপর, তবুও সামগ্রিকভাবে এটি দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে সহায়ক হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

[custom_poll]